kalerkantho


টাকা না পেয়ে কারখানায় তালা মেরে দিলেন এসআই

হায়দার আলী, ঢাকা ও মনিরুজ্জামান মনির, নরসিংদী    

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৫:০৫



টাকা না পেয়ে কারখানায় তালা মেরে দিলেন এসআই

'স্যার, আপনি তো সাংবাদিক। আপনার লেখনীর কারণে ঘুষখোর ওসি বদলি হইছে। এখন যদি আমার কারখানার তালাটা খুলে দেন। থানার এসআই শাখাওয়াত হোসেন টাকার জন্য আমার কারখানায় তালা মেরে দিয়েছেন।'

গতকাল বুধবার সকালে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চালাকচর বাজারের ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী মো. রাজন মিয়া কালের কণ্ঠ'র কাছে এভাবেই আকুতি জানান। রাজন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, 'অনেকবার থানায় ঘুরছি, ওসি গাজী রুহুল ইমামকেও বলেছিলাম। টাকা দিইনি বলে কারখানার তালা খুলে দেননি এসআই শাখাওয়াত।' মনোহরদী থানার এ রকম চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ এখন মানুষের মুখে মুখে। অভিযুক্তদের মধ্যে ওসি গাজী রুহুল ইমামও আছেন, ৬৫ ইঞ্চি টিভি ঘুষ কেলেঙ্কারিতে তাঁকে 'ক্লোজড' করা হয়েছে।

সদ্য নিয়োগ পাওয়া মনোহরদী থানা ওসি ফখরুল ইসলাম মানুষের হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাতে এবং সকালে মিটিং করেছি। আমি পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি, থানার হাজতঘরে সাজানো আসামি দেখতে চাই না। প্রকৃত আসামি দেখতে চাই। প্রকৃত ক্রিমিনাল ধরেন, মাদক ব্যবসায়ী এবং ডাকাত-ছিনতাইকারী ধরে দেন। সাধারণ মানুষকে ধরে এনে ডাকাত বানানো, অপরাধী বানানোর মানসিকতা যাঁদের আছে তাঁরা বদলি হয়ে চলে যান।'

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী চালাকচর বাজারে আইপিএস ও ফ্রিজ টেলিভিশনের স্ট্যাবিলাইজারের ব্যবসা করেন রাজন মিয়া। তিনি নিজে পাকস্থলীর জটিল রোগে ভুগছেন। অসুখ নিয়েই ঢাকা থেকে যন্ত্রাংশ কিনে এনে আইপিএস এবং স্ট্যাবিলাইজার মেশিন বানিয়ে মনোহরদীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন তিনি। তাঁর জয়েন্ট স্টোক এবং শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বৈধ অনুমোদন আছে, পাশাপাশি নরসিংদীর বিসিক থেকে সনদ আছে। রাজন মিয়া জানান, গত ১৭ নভেম্বর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। এর দুই দিন পর রাত ২টায় এসআই শাখাওয়াতসহ পুলিশ কারখানার খোঁজ নিতে আসেন। এর ১০-১২ দিন পর কারখানায় তালা মেরে দেন এসআই শাখাওয়াত; পরে ওসি রাজনকে থানায় ডেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন রাজন।

তবে এসআই শাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'উনার কারখানার কাগজপত্র ঠিক ছিল না তাই তালা মেরেছি।' তিনি কাগজপত্র দেখার বৈধ কর্তৃপক্ষ কি না জানতে চাইলে শাখাওয়াত বলেন, 'ভাই আমি ওসি গাজী রুহুল স্যারের নির্দেশে করেছি। ব্যবসায়ীকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেন, আমি তালা খুলে দিব।' টাকা দাবির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

কালের কণ্ঠ'র অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া যায়, মনোহরদী থানার পাঁচ পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে রয়েছেন উপপরিদর্শক (এসআই) শাখাওয়াত হোসেন, এএসআই শাহিনুর আলম, এএসআই দুলাল, এএসআই সাইদুর রহমান। এই চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওসি গাজী রুহুল ইমাম মনোহরদী থানায় আসার পর থেকেই চার কর্মকর্তা বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

এ প্রসঙ্গে নতুন আসা ওসি বলেন, 'আমরা মানুষের সেবার জন্য এসেছি, সেবাটাই করতে চাই। আমি ঘুষ খাই না, চাঁদাবাজি করি না। আমার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে আটক করে আমাকে যেন খবর দেয়, সেই মেসেজটিও সাধারণ মানুষকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা দ্রুত করব।'

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, থানা পুলিশের চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন মনোহরদী উপজেলা প্রকৌশলীর অফিসের নৈশপ্রহরী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'মাঝ রাতে দরজা খুলতে দেরি কিন্তু আমাকে গাড়িতে তুলতে দেরি হয়নি। আমাকে এসআই সাইদুর বলেন, তোকে এখন থানায় যেতে হবে। আমার অপরাধ কী? জানতে চাইলে বলেন ওসি সাহেব জানেন। থানায় সারা রাত আটকে রাখেন এবং ১০ লাখ টাকা দাবি করেন।' অনেক কষ্টে ওসির হাতে ৮২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে ছাড়া পান বলে জানান আরিফুল।

গত ২৩ ডিসেম্বর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের স্ট্যাম্প বিক্রেতা আবুল কালামকে রাস্তায় আটক করেন এএসআই সোহেল রানা। ওসির কথা বলে এসআই সোহেল ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেন আবুল কালাম। তিনি বলেন, 'শরীর চেক করে কিছুই না পেয়ে আমার মোটরসাইকেলের লুকিং গ্লাসের ভেতর ইয়াবা দিয়ে আমাকে থানায় নিয়ে যান।'

উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির অফিস পিয়ন রুবেল মিয়াকে চন্দনবাড়ির নিজ বাড়ির সামনে বাবা কাজীমুদ্দিনের সামনে থেকেই এসআই সাইফুল ও এসআই দুলাল চরথাপ্পড় মেরে ধরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। মো. রুবেল মিয়া বলেন, 'আমার অভিযোগ কী জানতে চাইলে এসআই সাইফুল ইসলাম ও এএসআই দুলাল বলেন, আমি নাকি ইয়াবা খাই। ৫০ হাজার টাকা ওসিকে দিয়ে থানা থেকে মুক্তি পাই।' অভিযোগ প্রসঙ্গে থানার এএসআই সোহেল রানা বলেন, 'ওই সময় ডিউটি অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। রুবেলকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। তবে টাকা নিয়ে ছাড়া হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।' 



মন্তব্য