kalerkantho


রোগীকে সর্বোচ্চ এক মিনিট সময় দেন চিকিৎসকরা

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও    

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:২০



রোগীকে সর্বোচ্চ এক মিনিট সময় দেন চিকিৎসকরা

সকাল প্রায় ১০টা। ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতাল ভবনের দোতলার মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ড।

শুধু একজন চিকিৎসক রোগীদের খোঁজখবর নিয়ে চলে গেছেন। সেখানে কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা হয়। সদর উপজেলার শ্রীকৃষ্টপুরের বাসিন্দা লিটন রানা জানালেন, তিনি পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর অভিযোগ, ভর্তি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে তাঁকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকরা দিনে একবার এসে এক মিনিট কথা বলতে না বলতেই চলে যান।

এমন অবস্থা প্রায় সব রোগীর ক্ষেত্রেই। তাঁদের দাবি, ৩০ সেকেন্ড থেকে সর্বোচ্চ এক মিনিট সময় দেন চিকিৎসকরা। রোগীদের নিজের অসুখের কথা ঠিকমতো খুলে বলারও সময় দেন না তাঁরা।

মেডিসিন ওয়ার্ডেরই আরেক রোগী মুজিবর রহমানের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ দৌলপুর থেকে এসেছেন গত রবিবার। মুজিবর বলেন, এই শীতের দিনে হাসপাতালে রাতে খুব ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু এখানে শীত নিবারণের জন্য রোগীদের কোনো গরম কাপড় বা কম্বল দেওয়া হয় না। এতে করে এক রোগের চিকিৎসা নিতে এসে ঠাণ্ডাজনিত আরেক রোগে আক্রান্ত হতে হয়।

একই বিভাগের ১২ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন রোগী চিত্কার করছিলেন। কাছে গিয়ে জানা গেল, হুমায়ুন কবির নামের এ রোগীকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিত্কার করছেন কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাতে স্যালাইন লাগানোর পর থেকে তিনি ব্যথা অনুভব করছেন। এর মধ্যে রক্ত বের হয়ে স্যালাইনের ব্যাগে উঠতে শুরু করেছে। তাই খুব জোরে জোরে চিত্কার করে নার্সদের ডাকছেন তিনি। হুমায়ুন বললেন, 'কেউই এখানে নেই। কারো কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, এ অবস্থায় কী করব বুঝতে পারছি না।'

এ কয়েকটি চিত্র গতকাল বুধবারের। সকাল ৯টায় সদর হাসপাতালের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই মোবাইল ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে একটি ফোন আসে। পরিচয় জানতে চাইলে অন্য প্রান্ত থেকে জানানো হয়, তাঁর নাম মো. মুসা। বললেন, 'আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সকালে কালের কণ্ঠ পত্রিকা পড়েছি, সুন্দর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ করেছেন।' তিনি জানান, কয়েক দিন আগে তিনি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। টিকিট কাউন্টারের এক কর্মচারী তাঁকে লাঞ্ছিত করেছিলেন। পরে হাসপাতাল থেকে ফিরে বাইরের ক্লিনিকে চিকিৎসক দেখান তিনি।

মুসার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বহির্বিভাগে আসেন এ প্রতিবেদক। রোগীর ভিড় বাড়ছে। কিন্তু টিকিট কাউন্টার খোলা হয়নি। তখন সকাল ৯টা ১৫ মিনিট। অবশেষে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে টিকিট কাউন্টারের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন সফিকুর রহমান নামের একজন কর্মচারী। এবার টিকিট নিয়ে চিকিৎসক দেখানোর পালা। কিন্তু কিসের কী-কক্ষ খোলা থাকলেও ভেতরে চিকিৎসক নেই।

কোনো কোনো চিকিৎসকের কক্ষে দেখা গেল শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের। মো. রবি হাসান নামের একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দিতেও দেখা গেল। আর পাশে বসে তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন আরেক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক কামরুন্নাহার। শিক্ষানবিশ অবস্থায় রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া যায় কি না- এ নিয়ে কথা হয় ডা. তোজাম্মেল হকের সঙ্গে, কারণ তাঁর কক্ষে বসেই রবি হাসান ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছিলেন। ডা. তোজাম্মেল বললেন, ‘ডাক্তারদের উপস্থিতিতে শিক্ষানবিশরা পাশে থেকে ডাক্তারের নির্দেশে ব্যবস্থাপত্র লিখতে পারবেন। তবে সদর হাসপাতালে এ চর্চা নেই। কোনোভাবেই শিক্ষানবিশদের এ কাজ করার অনুমতি প্রদান করা হয়নি।' আর যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে এ ব্যাপারে তিনি শিক্ষানবিশদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দেবেন বলে জানালেন ডা. তোজাম্মেল। তাঁর সঙ্গে কথা হয় হাসপাতালের দোতলায় মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডে। এরপর সেখান থেকে নিচতলায় এসে শিশু বিভাগে ঢুকতেই নাকে ধাক্কা দেয় তীব্র দুর্গন্ধ।

শিশু বিভাগের তিনটি কক্ষেই রোগী ঠাসা। শুধু তাই নয়, বারান্দার মেঝেতেও বিছানা পেতে রয়েছে প্রায় ৩০ শিশু। সঙ্গে আছেন তাদের মা ও অন্য স্বজনরা। এসব শিশুর কারো নিউমোনিয়া, কারো ডায়রিয়া, কারো হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট আবার কারো রয়েছে বমি ও জ্বর। অর্থাৎ হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এসব শিশুর প্রায় সবারই বয়স এক মাস থেকে ১৮ মাস।

পাশের জেলা পঞ্চগড়ের আটোয়ারী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর মা নুমাই বেগম বলেন, 'এখানে অনেক রোগীর কারণে যেখানে সেখানে বাচ্চারা প্রস্রাব-পায়খানা করছে। এর কারণে গন্ধ হচ্ছে খুব।'

আরেক শিশুর মা জয়ন্তী রানী, তিনি এসেছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া থেকে। বললেন, 'অনেক বাচ্চা বমি করছে, আর অনেকেই ঠাণ্ডা লাগার কারণে ঘন ঘন পায়খানা করছে। এসব ময়লা বাচ্চাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকরা বারান্দাতেই ফেলছে। এখানে ময়লা পরিষ্কার না করার কারণে মাছি ভন ভন করছে, সঙ্গে রয়েছে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ।'

দুপুর সাড়ে ১২টা। হাসপাতালের বহির্বিভাগে পুরুষ, নারী, শিশুসহ শতাধিক রোগী তখনো চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর ভেলাজান এলাকা থেকে সকাল ১০টায় হাসপাতালে এসেছেন শাপলা আক্তার। টিকিট কেটে বসে রয়েছেন প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু এখনো চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। সেখানে অপেক্ষমাণ আরো কয়েকজন রোগী জানালেন তাঁরা ডা. মনজুর মোরশেদ হোসেন ও ডা. স্মৃতি হকের অপেক্ষায় রয়েছেন।

দুপুর ১টা। বহির্বিভাগে টিকিট কাউন্টারে হৈচৈ শোনা যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে জানা গেল, টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তখনো ১৫-২০ জন রোগী টিকিটের জন্য সারিতে দাঁড়ানো।

এরপর কথা হয় ঠাকুরগাঁও জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবু মো. খায়রুল কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'সরকারি এ হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা উন্মুক্ত। হাসপাতালের ভেতরে কোনো কর্মচারী রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর হাসপাতালের সব নিয়ম মেনে চলার জন্য সব চিকিৎসককে বলা হয়েছে। তার পরও কেউ নিয়ম অমান্য করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

সিভিল সার্জন জানালেন, শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও নার্সদের সতর্ক করা হয়েছে, প্রয়োজনে আরো কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হবে। জনবল সংকটের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কর্মী নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। খুব দ্রুত সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

 



মন্তব্য