kalerkantho


নবীগঞ্জ

মাটি 'সন্ত্রাস'

বারোটা বাজছে উর্বরতার

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি    

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:০৩



মাটি 'সন্ত্রাস'

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের কুর্শি ইউনিয়নের সমরগাঁওয়ে এভাবেই ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটার মালিকরা (বাঁয়ে); মৌলভীবাজারের বড়লেখার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের বড়আইল গ্রামের জামাল আহমদের বাড়ির টিলা কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফসলি জমির মাটি। কেটে সরিয়ে ফেললে ওই জমি উর্বরতা হারাবে। কয়েক বছর ভালো ফসল ফলবে না। কোনো কোনো জমিতে একেবারেই ফসল ফলবে না। এই সর্বনাশই করা হচ্ছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে আইন ভেঙে ফসলি জমির মাটি অবাধে কেটে নেওয়া হচ্ছে ইট তৈরির জন্য। জমির মালিকরা চাপে পড়ে বা সামান্য টাকার জন্য ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন এই মাটি।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর ৫-এর-১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে তা ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ না থাকায় নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ১৬টি ইটভাটার বেশির ভাগেই ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন গ্রামের সহজ-সরল জমির মালিকরা দালালদের পাল্লায় পড়ে মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে ফসলি জমির উর্বর মাটি বিক্রি করছেন। এতে জমির উর্বরতা কমে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উপজেলার প্রায় সর্বত্র প্রতিবছর শীতের শুরুতে জমে ওঠে এই ফসলি জমির মাটি বেচাকেনার ব্যবসা। এক শ্রেণির দালাল আছে যাদের কাজ হচ্ছে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের লোভ দেখিয়ে কম দামে মাটি সংগ্রহ করা। এর বিনিময়ে দালালরা বেশ টাকা পায়। এসব মাটির বেশির ভাগ যায় ইটভাটায়। রাস্তাঘাট নির্মাণ ও বসতভিটার কাজেও ব্যবহার করা হয়। জমির মালিকরা বিবেচনা না করেই পানির দরে মাটি বিক্রি করে যাচ্ছেন। এলাকায় অনেক ইটভাটা থাকায় প্রভাবশালী ভাটার মালিকরা দালালদের মাধ্যমে কৌশলে জমির মালিকদের মাটি বিক্রিতে বাধ্য করেন।

স্থানীয়ভাবে যে মাটি প্রতি হাজার ঘনফুট এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয় সেই মাটি কৃষকদের কাছ থেকে দালালরা কেনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এভাবে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটায় উর্বরতা কমার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির উর্বরতা মাটির ওপরের ১২ থেকে ২০ ইঞ্চির মধ্যে থাকে। তাই ওপরের মাটি বিক্রি করায় জমির উর্বরতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সমাজসচেতন ব্যক্তিরা বলেন, প্রতিবছর যে হারে ফসলি জমির মাটি বিক্রি হচ্ছে তা ভালো লক্ষণ নয়।

সম্প্রতি নবীগঞ্জ উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের সমরগাঁওয়ে একটি ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে গাড়িতে ভরার দৃশ্য নজরে আসে। এ সময় আলাপে স্থানীয়রা জানান, এই মাটি ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য (মেম্বার) নিজেই বিক্রি করছেন ‘গোল্ড’ নামে একটি ইটভাটায়।

নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দুলাল উদ্দিন বলেন, ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার ফলে জমির জৈব পদার্থ কমে যায়। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এই জমিতে কয়েক বছর ভালো ফসল উৎপাদন হবে না। পরিবেশও ভারসাম্য হারাবে। দেশে চাহিদামতো খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা বন্ধ জরুরি।



মন্তব্য