kalerkantho


ডায়রিয়া ওয়ার্ড নিজেই অসুস্থ

আব্দুল আজিজ শিশির, শরীয়তপুর    

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:২১



ডায়রিয়া ওয়ার্ড নিজেই অসুস্থ

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ক্ষণিক বিরতি চলছে। আকাশ যথারীতি মেঘলা। গতকাল রবিবার সকালে এমন আবহাওয়ার মধ্যেই অটোরিকশাযোগে একটি শিশুকে কোলে নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন এক নারী। সঙ্গে একজন পুরুষও আছেন। চিকিৎসক দেখার পর শিশুটিকে ভর্তি করা হয় ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। সেখানে গিয়ে কথা হলো ওই নারীর সঙ্গে। জানালেন, তাঁর নাম শারমিন বেগম। স্বামীর নাম নূরুল ইসলাম হাওলাদার। ১৭ মাস বয়সী শিশুসন্তান সামিয়া ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোগীর ভিড় অনুপাতে বেডসংখ্যা খুবই কম।

বাধ্য হয়ে অন্য অনেক রোগীর মতো নিজেও ওয়ার্ডের মেঝেতে শয্যা পেতে সন্তানের সুশ্রূষা করছেন। তখন সকাল ১০টা বাজে। ম্যাক্সিমাম শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল ভবনের নিচতলায় উত্তরপাশে ডায়রিয়া ওয়ার্ড। ওয়ার্ডটিতে শয্যাসংখ্যা দশ। সেবিকার কক্ষে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গতকাল সকাল ১০ পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে ১৯ জন রোগী ভর্তি করে সেবা দেওয়া হচ্ছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে উৎকট দুর্গন্ধ। কক্ষ লাগোয়া বাথরুমের অবস্থা তো এককথায় ভয়াবহ। অথচ এটিই জেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের এখানেই ছুটে আসতে হয়।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডে কথা হলো সেবা নিতে আসা নাহিদা বেগমের (২০)

সঙ্গে। জানালেন, তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার আঙ্গারিয়ায়। পাঁচ দিন আগে ৯ মাস বয়সী সন্তান ছাঈদ বেপারী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শিশুটিকে এখানে এনে ভর্তি করেন। সন্তানের শারীরিক অবস্থা এখন কিছুটা ভালো। তবে এই পাঁচটি দিন হাসপাতালে সন্তানের পাশে কেটেছে নরকের মতো। হাসপাতালের পরিবেশ যে এতটা আবর্জনাময় হতে পারে তা এখানে না এলে বিশ্বাস হতো না। নাহিদা বলেন, ‘একে তো শয্যাসংখ্যার কয়েক গুণ রোগী, তার ওপর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেখাই মেলে না। সকালে একবার এসে কোনো রকমে ঝাঁট দিয়ে চলে যায়। ওইটুকুই। সারা দিনে আর ওদের কেউ এখানে আসে না। বাথরুম থেকে প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ছড়ায়। সেটির আবার দরজা বন্ধ করা যায় না। ’

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) সুমন কুমার পোদ্দার এসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি আর কী বলব, আপনি নিজেই তো ঘুরে দেখে এসেছেন। ’

হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয় তলায় গাইনি, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ড। অপরিচ্ছন্নতা বিচারে সেখানেও অভিন্ন চিত্র। সেবা নিতে আসা অনেকেই হাসপাতাল থেকে দেওয়া বিছানার চাদর পরিবর্তন করে সঙ্গে আনা বিছানার চাদর বিছিয়ে রেখেছে।

বকুল বেগম (২৫) দেড় মাসের শিশু আকফানকে নিয়ে শনিবার ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘এটি নামেই কেবল সদর হাসপাতাল। ওয়ার্ডে বেড ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিস ধরতে গেলে গা ঘিন ঘিন করে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া বিছানার চাদরে অনেক ময়লা। তাই বাড়ি থেকে আনা চাদর বিছিয়ে নিয়েছি। বাথরুমের দরজা ভাঙা। চব্বিশ ঘণ্টা সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ’

হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় পুরুষ ওয়ার্ড। সেখানে দেখা যায়, ছাদের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে ঘেমে ঘেমে পানি পড়ছে। পানি পড়ার কারণে কোথাও কোথাও শয্যা সরিয়ে মেঝেতে জায়গা ফাঁকা করে রাখা হয়েছে।

সদর হাসপাতালের হিসাবরক্ষক ও দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী বজলুর রশীদ জানালেন, হাসপাতাল ভবনটি শুরুতে একতলা ছিল। তখন এটি ছিল ৫০ শয্যার। একতলা ভবনটিই পিলার যুক্ত করে তিনতলায় উন্নীত করা হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পিলারগুলোর ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পানি আসে। বিভিন্ন কক্ষের বৈদ্যুতিক পাখাগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। গরমের সময়ে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এক শ শয্যার এই হাসপাতালে জায়গার সংকটও প্রবল। এ ছাড়া সদর আধুনিক হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুল্যান্স থাকার কথা থাকলেও আছে একটি। এতে রোগী আনা-নেওয়ায় ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বাইরে থেকে অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করতে হয়।

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ডায়রিয়া ওয়ার্ডটির অবস্থা একটু খারাপ। কিন্তু কক্ষসংকটের কারণে ওয়ার্ডটি স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ থাকলেও সংখ্যায় কম রয়েছে। মাত্র পাঁচজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার জন্য অনুমোদন হয়েছে। তখন নতুন আরো একটি ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনটি নির্মাণ হয়ে গেলে ওয়ার্ডটি স্থানান্তর করা হবে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দূর করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ’

   

 

 

 


মন্তব্য

Akram commented 16 days ago
দেশে বেকারের হার অনেক বেশি । তাই কাজ সঠিক না করলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।