kalerkantho


রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে স্থানীয়রা বেজার, বাঁধা দিলে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর উদ্বেগ

চার দিন অপেক্ষার পর রোহিঙ্গা ঢলের আশ্রয় কুতুপালং

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



চার দিন অপেক্ষার পর রোহিঙ্গা ঢলের আশ্রয় কুতুপালং

ছবি: কালের কণ্ঠ

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অব্যাহতভাবে অনুপ্রবেশরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কক্সবাজারের প্রশাসন। এতদিন ধরে সীমান্তের অনুপ্রবেশকে স্থানীয় বাসিন্দারাও মানবতার দৃষ্টিতে দেখেছিলেন।

এ কারণে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয়দের সমবেদনার কমতি ছিল না। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই এলাকায় রোহিঙ্গাদের ভার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এতে করে এলাকাবাসী হয়ে উঠছে অতীষ্ঠ। তদুপরি বর্তমানে যেসব রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে আসছে তারা নেহায়েত ত্রাণ সামগ্রীর লোভে পড়ে এবং এপারে আসা তাদের স্বজনদের ডাকে আসছে-এমনই বিশ্বাস স্থানীয়দের।

এদিকে গত চার দিন ধরে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমান পারা নো ম্যাসন ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা আজ বৃহস্পতিবার আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং শিবিরে।

সীমান্তের বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। অপরদিকে সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকালে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় 'উদ্বেগ' প্রকাশ করে বসে। অনুপ্রবেশকারি রোহিঙ্গাদের নিয়ে এরকম এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে কক্সবাজারের প্রশাসন।

প্রশাসনের ক'জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে কালের কণ্ঠকে বলেন, সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা আসলে স্থানীয় বাসিন্দারা বেজার (রাগ) হন।

অন্যদিকে সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বাঁধা দিলে বেজার হন আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজন। ' ব্যাপারটি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রশাসনই এখন চরম বিপাকে।

কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমান পাড়ার কৃষক আবুল কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'গত ২৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে আমরা নিজেরাও দেখেছি রাখাইনের নির্যাতিত রোহিঙ্গারা আশ্রয়ে আসছে বিপদের মুখে পড়ে। তখন দেখেছি অনেক নির্যাতিত রোহিঙ্গাই ছিলেন ক্ষত-বিক্ষত। তাই আমরা তাদের গ্রহণ করেছি। ' তিনি বলেন, এখন যারা আসছে তাদের অবস্থা ভিন্ন। সেখানে পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে। যারা আসছে তারাও রয়েছে সম্পূর্ণ অক্ষত।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। এলাকার সার্বিক পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে। এরকম অবস্থায় এলাকার লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এ কারণেই এলাকাবাসী এখন তাদের সংক্ষুব্ধের কথা ব্যক্ত করছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মঞ্জুর এসব কথা জানিয়ে আরো বলেন, প্রকৃত নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। এখন আমরা আর নতুন করে রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে চাইনা। আমরাই বলছি-নো মোর রোহিঙ্গা। '

পরিকল্পিত উখিয়ার সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এখন রাখাইনে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে। তাই নির্যাতনের মুখে এখন রোহিঙ্গারা আসছে না। বাস্তবে এপারের এক শ্রেণির লোকজন তাদের প্রলুব্ধ করেই নিয়ে আসছে। '

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার নাফনদ তীরের নো ম্যানস ল্যান্ডে টানা চার দিন অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গারা শেষ পর্যন্ত গতকাল বৃহস্পতিবার কুতুপালং ও বালুখালী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি কর্তৃপক্ষ গত মঙ্গলবার থেকে এসব রোহিঙ্গাদের নো ম্যানস ল্যান্ডে জমায়েত করে রেখেছিল। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিজিবি অপেক্ষমান রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নিতে শিবিরে যেতে সহযোগিতা দেয়ার কাজ শুরু করে। এসব রোহিঙ্গার সংখ্যা গণনায় পাওয়া গেছে, ৭ হাজার ৮৫৭ জন।

বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়ানের উপ-অধিনায়ক মেজর আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, এসব রোহিঙ্গাকে বালুখালী ও কুতুপালং ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব রোহিঙ্গা সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়ে থাকার পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সারিবদ্ধভাবে বিজিবি গণনা করে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের কাজে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক এনজিও সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নিকট হস্তান্তর করেছে।

কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলা রাখাইনের বুচিডং পাঁচকরিবিলা এলাকার বাসিন্দা আমান উল্লাহ (৪০) বলেন, সীমান্তে চার দিন কষ্ট পেলেও তার কোন দুঃখ নেই। কারণ মিয়ানমারে যে নির্যাতন, সহিংসতা চলতেছে তাতে তারা প্রতিটি মুহূর্তে জন্য নিরাপদ নয়। যার কারণে ৮দিন পায়ে হেটে বুচিডং থেকে আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তের পৌঁছে। সেখানে চার দিন অপেক্ষার পর বিজিবি বৃহস্পতিবার সকালে কুতুপালং নিয়ে আসে। সে জন্যে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ প্রকাশ করেন তিনি।     

আরেক রোহিঙ্গা যুবক রাখাইনের বুচিডং বাঘঘোনা এলাকার ছানাউল্লাহ (২২) জানান, এর আগে আর কখনো বাংলাদেশে আসেনি। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করার ভয়ে চলে এসেছি। সহিসংতার শুরুর পর থেকে সে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকছিল। পরে সুযোগ বুঝে বাংলাদেশ চলে আসে। পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা আগেই মিয়ানমার থেকে চলে এসেছে বলে জানায় সে।

রাখাইনের ভুচিদং এলাকার আজিজা খাতুন (৩৫) ৭ সদস্য নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে। তিনি জানান, নাফনদ তীরের আঞ্জুমান পারা নো ম্যানস& ল্যান্ডে ৪ দিন ধরে অপেড়্গায় থাকাকালীন সময়ে আমরা খাবার-দাবার ও চিকিত্সা সেবা পেয়েছি। তবে কেবল থাকার জায়গাটি ছিল না। '

রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বে  মানবাধিক ও পরিবেশ কর্মীদের একটি দল আজ বৃহস্পতিবার উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। তারা আশ্রয় নেওয়া নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনেন। পরে তারা নাফনদ তীরের আঞ্জুমান পারা এলাকায় গিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলেন।

রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন প্রতিরোধ বিষয়ক সভা
মিয়ানমারের 'রাখাইনে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে জন্মনিবন্ধন প্রতিরোধ' সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভা আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) জ্যোতির্ময় বর্মন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ সচিব আনোয়ারুল নাসের, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা ও মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান বক্তৃতা করেন। সভায় সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ পেশাজীবীরা অংশগ্রহণ করেন।


মন্তব্য