kalerkantho


দূষণকারী কারখানার ফেলনাই ওষুধশিল্পের দরকারি উপকরণ

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ১৪:৪০



দূষণকারী কারখানার ফেলনাই ওষুধশিল্পের দরকারি উপকরণ

বাধাবিপত্তির মধ্যেও টিকে আছে হাড় গুঁড়া করার কারখানা। খুলনার লবণচরে মেসার্স রিয়াদ ট্রেডিং অ্যান্ড বোন মিলের অভ্যন্তরের দৃশ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফেলনা নয় কোরবানির পশুর হাড়। হাড়ের গুঁড়া ওষুধ, সার ও মুরগির খাবার তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়।


বিশেষত ওষুধশিল্পের কাঁচামাল তৈরিতে এসব হাড়ের গুঁড়ার চাহিদা অনেক বেশি। দেশের একটি ওষুধ কম্পানিতে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়। উপরন্তু গরু-মহিষের শিং  থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণকারী গ্যাস উৎপাদিত হয়, যা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে ব্যবহূত হয়।

খুলনা শহরের রূপসা সেতু এলাকার কাছে বেশ কয়েকটি হাড় গুঁড়া করার কারখানা রয়েছে। যেখানে পশুর হাড় সংগ্রহ করে শুকিয়ে গুঁড়া করা হয়। হাড় জমিয়ে রাখা ও গুঁড়া করার সময় দুর্গন্ধ ছড়ানোয় সাধারণভাবে এটি পরিবেশ দূষণকারী কারখানা হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি খুলনা মহানগরীর লবণচরার একটি হাড় কারখানায় সরেজমিনে দিনের বেলা কারখানা বন্ধ দেখা যায়। রাতে হাড় গুঁড়া করা হয়। ঈদুল আজহা উপলক্ষে তারা অনেক বেশি হাড় জোগাড় করেছে, যা বস্তাবন্দি করে রাখা হয়েছে।

তবে কারখানাগুলো আর আগের মতো হাড় জোগাড় করতে পারছে না।

স্থানীয় ও কারখানায় কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লবণচরা স্লুইস গেট থেকে রূপসা সেতু পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাঁচ-ছয়টি হাড় গুঁড়া করার কারখানা, মুরগির বিষ্ঠা ও চিংড়ির খোসা গুঁড়া করার কারখানা গড়ে ওঠে। যার অধিকাংশই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দুটি কারখানা চালু আছে; তাও দিনের বেলায় বন্ধ থাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন প্রাণীর হাড়, মুরগির বিষ্ঠা, সাগরের পচা মাছ, মাছ কম্পানির চিংড়ির খোসা সংগ্রহ করে অপেক্ষাকৃত জনমানবহীন স্থানে রেখে তা শুকিয়ে, পরে তা বস্তাবন্দি করে কারখানায় আনা হয়। এরপর ওই হাড় মিলের ভেতরের চাতালে ভালোভাবে রোদে শুকানো হয়। পরে তা ক্রাশিং মেশিনে গুঁড়া করা হয়।

হাড় গুঁড়া করার ক্রাশিং মেশিন ইট ভাঙানো মেশিনের মতো। ক্রাশিং মেশিনে হাড় দিলে টুকরা টুকরা হয়, পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মার্বেল পাথরের আকৃতির হয়, আর একটি অংশ একেবারে আটা বা ময়দার মতো গুঁড়া হয়ে যায়। ওষুধ কম্পানিতে টুকরা টুকরা খণ্ডের হাড়গুলো বিক্রি হয়। এই হাড়ের প্রতি কেজির মূল্য ২৭ টাকা। অপসোনিন কম্পানি একারই প্রতি মাসে ৮০০ থেকে ৯০০ টন হাড়ের গুঁড়া প্রয়োজন হয়। ওষুধ তৈরি বিশেষত ক্যাপসুলের খোসা তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। খুলনার এই হাড় কারখানাগুলো প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টন হাড়ের গুঁড়া এই ওষুধ কম্পানিকে সরবরাহ করতে পারে। অন্যান্য উৎস থেকে তারা বাকি প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে।

জানা যায়, গেল শতকের আশি-নব্বই দশকের দিকে খুলনার লবণচরা স্লুইস গেট এলাকার কাছে বেশ কিছু হাড় চূর্ণ করার কারখানা গড়ে ওঠে। এসব কারখানায় পশুর হাড় ও চিংড়ির খোসা জড়ো করে তা শুকিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয়। পশুর হাড় শুকানো এবং চূর্ণ করার সময় উত্কট গন্ধ বেরোয়। তখন ওই এলাকায় মানুষের বসতি ছিল না বললেই চলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকায় বসতি বাড়ে, এলাকাবাসীও এই হাড় কারখানার দুর্গন্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।    

দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় খুলনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব কারখানা লবণচরা  থেকে বটিয়াঘাটা উপজেলার পুটিমারী এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উপরন্তু কারখানার বিরুদ্ধে খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের হয়। আদালত কারখানাগুলোকে জরিমানা করে এবং কারখানাগুলোকে পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর  থেকে দূষণকারী এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার আদালতের নির্দেশ মানার জন্য নির্দেশনা জারি করেছে।

জানতে চাইলে নিউ খুলনা বোন মিলের মালিক মো. বেলাল হোসেন জানান, লবণচরা এলাকায় যখন হাড় গুঁড়া করার কারখানা স্থাপিত হয়েছিল তখন এখানে লোকবসতি ছিল না বললেই চলে; রূপসা সেতু হওয়ায় লোকজনের বসতির পাশাপাশি অনেক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। প্রাণীর হাড় ও মুরগির বিষ্ঠাসহ অন্যান্য দ্রব্যের দুর্গন্ধে লোকজনের অসুবিধা হয় এ কারণে কারখানা আর আগের মতো চালু নেই। অনেক কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। পশুর হাড়ও এখন আর তেমন পাওয়া যায় না।

মেসার্স রিয়াদ ট্রেডিং অ্যান্ড বোন মিলের মালিক মো. জালাল হোসেন বলেন, কারখানাটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে; মাঝেমধ্যে চালু করা হয়। হাড় প্রক্রিয়াজাত করার সময় দুর্গন্ধ ছড়ায় বলে প্রতিষ্ঠানটিকে দূষণসৃষ্টিকারী বলা হয়; অথচ এর উপাদানগুলো মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ওষুধ তৈরি এবং মাছ ও পোল্ট্রির খাবার তৈরিতে এই হাড়ের গুঁড়া ব্যবহূত হয়; আবার সার তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা হয়।

 


মন্তব্য