kalerkantho


চার দিন বন্যার পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন রাশেদুল

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম ও কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী   

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:৩৬



চার দিন বন্যার পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন রাশেদুল

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ধরলার তীরবর্তী গ্রাম বাংটুরঘাট। ওই গ্রামের বাসিন্দা রাশেদুল।

বন্যার পানির তোড়ে তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বাঁধের পূর্বেও ভাঙে, পশ্চিমেও ভাঙে। মাঝে আটকা পড়েন রাশেদুল। এ অবস্থায় না খেয়ে ছিলেন চার দিন। পরে কলাগাছ নিয়ে ভেসে এক কিলোমিটার দূরে কাঁঠালবাড়ী মাদরাসার কাছে সেতুতে উঠে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

বেঁচে থাকার এই সংগ্রামের কথা জানিয়ে গতকাল শনিবার রাশেদুল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'চাইর দিন না খাইয়া আছিলাম। খালি বানের পানি খাচি। '

ওই বাঁধ ভাঙনের কবলে পড়েছিলেন বাহাদুর মিয়া নামের আরেকজন। তিনি কিছু বাঁচাতে না পারলেও চলে আসতে পেরেছিলেন। বাহাদুর বলেন, 'জীবন রক্ষা করব্যার পাচি, এটাই।

আর কোনো কিছু হামার নাই। '

বন্যার কবলে পড়ে তাঁদের মতো কয়েক শ লোক আশ্রয় নিয়েছিল বাংটুরঘাট এলাকায়। পানি নামতে শুরু করায় অনেকে ঘরে ফিরে গেছে। কিন্তু যাদের ঘরেরই চিহ্ন নেই বা ঘর এখনো পানির নিচে তাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়? তারা পড়ে আছে বাঁধেই, পলিথিনের ছাউনির নিচে।

এখনো বাঁধে আশ্রয় নিয়ে থাকা মরিয়ম, আকবর, সাবাজ উদ্দিন, দেলোয়ার, দুলালসহ অনেকে জানায়, তাদের বাড়িতে এখনো পানি। ঘর ভেঙে পড়ে আছে। ফিরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হবে তাদের। হাতে টাকা-পয়সা নেই।

৮০ বছরের বৃদ্ধা মরিয়ম বলেন, 'কোনো কিছু বাঁচপার পাই নাই। খেতা-বালিশ, হাঁড়ি-পাতিল সউগ ভাসি গেইছে। জীবনটা কোনোমতে বাঁচপ্যার পাইচি বাবা। '

দেলোয়ার বলেন, 'হামরা দিনমজুরি করি খাই। এলা কাজকাম নাই। চাউল কিনব্যার পাই না। বাড়ি ছাড়চি সাত দিন হয়। চলি কেমন করি?'

গতকাল দুপুরে ধরলাতীরবর্তী বাংটুরঘাট, মণ্ডলপাড়া ও সন্ন্যাসী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সর্বত্রই বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ। সন্ন্যাসী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে কাঁঠালবাড়ী আসার পথে সড়কটি অনেকটাই পাকা ছিল। এখন খানাখন্দে ভরা। আশপাশে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খায়রুল ইসলাম বলেন, 'এই ওয়ার্ডের দুই হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত। মাত্র ২২৫টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। মানুষের চাহিদা অনেক। কাকে রেখে কাকে দেই। '

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল আমিন আজাদ বলেন, 'পর্যায়ক্রমে সবাইকে সরকারি ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে। বেসরকারি সংস্থাও সাহায্য করছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হবে। '

এদিকে গতকাল ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন জনপদ রাজীবপুর উপজেলার নাওশালা চরে গেলে বানভাসি হানেকা খাতুন বলেন, 'ঘর ছাইড়া দিয়া আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। এহনো বাড়ি থিকা পানি নামেনি। খাইয়া না খাইয়া দিন যাচ্ছে আমগর। ছয় দিন অইল কেউ খোঁজ নিবার আইল না। '

রাজীবপুর উপজেলার একেবারে পশ্চিমে নাওশালা চরের অবস্থান। মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত এ চর। স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল হক জানান, নাওশালা চরে বন্যায় আড়াই শ পরিবারের বাড়িঘর ডুবে গেছে। মানুষজন চরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যাতায়াতে সমস্যার কারণে উপজেলা প্রশাসনেরও কেউ ত্রাণ দিতে আসেনি। চরের বাসিন্দা মতিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, 'আমগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খালি বাইচা বাইচা তার পছন্দের মানুষগরে ত্রাণ দিছে। যারা একবার ত্রাণ পাইছে তাগরেই আবারও দিছে। '

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোহনগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, 'আমার ইউনিয়ন প্রায় পুরোটাই বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে প্রায় সাত হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে সরকারিভাবে আমাকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ১৭ টন চাল। প্রতিদিন চার-পাঁচ টন করে। এ বরাদ্দ দিয়ে সবাইকে ত্রাণ দেওয়া যায় না। আর নাওশালা চরটি অনেক দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না। '

একইভাবে রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন পালের চর, গোয়ালের চর, দক্ষিণ খঞ্জনমারা, উত্তরপাড়া খঞ্জনমারা, ফুলুয়ারচর, পশ্চিমপাড়া, মধ্যপাড়া, বাগুয়ারচর জামাইপাড়া, ধনারচর, জিগনিকান্দি, কাজাইকাটা এলাকায়ও সরকারি ত্রাণ পায়নি দুর্গতরা। পালের চরের মাজেদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'পাঁচ দিন পানির মধ্যে। এক বেলা খাওন পাইলেও দুই বেলা উপোস থাকছি। আমগর এক ছটাক ত্রাণও কেউ দেয়নি। '

নাসিমা বেগম, হামেলা বেগম, সুমারী খাতুন, শিল্পী খাতুনসহ অনেকে অভিযোগ করে, বানভাসিদের ত্রাণ না দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তা বিক্রি করে দিয়েছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার জাদুর চর ইউপি চেয়ারম্যান সরবেশ, বন্দবেড় ইউপি চেয়ারম্যান কবীর হোসেন ও চর শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, বন্যায় যে পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই পরিমাণ ত্রাণ তাঁরা বরাদ্দ পাননি। তবে তাঁরা স্বীকার করেন যে বরাদ্দ কম থাকার কারণে অনেক চরে যাওয়া হয়নি।

রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার দায়িত্বে ইউএনও ফাউজুল কবীর বলেন, 'চেয়ারম্যান-মেম্বারদের নির্দেশ দেওয়া ছিল বরাদ্দের মধ্যে বন্যায় যাদের বেশি ক্ষতি হয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের আগে দেওয়ার জন্য। কোনো চরের মানুষ যদি বঞ্চিত হয়ে থাকে তাহলে চেয়ারম্যানদের বলে দেওয়া হবে ওই সব চরে ত্রাণ দেওয়ার জন্য। ' তবে তিনি জানান, এখন পানি অনেক কমেছে। ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে।

 


মন্তব্য