kalerkantho


সরেজমিন: জামালপুরের ইসলামপুর

এহন না খেয়ে মরতাছি, কেউ ইলিফ দেয় না

আজিজুর রহমান চৌধুরী, জামালপুর প্রতিনিধি   

১৭ আগস্ট, ২০১৭ ১৯:৩৫



এহন না খেয়ে মরতাছি, কেউ ইলিফ দেয় না

জামালপুরের ইসলামপুরে বন্যার পানি ১৩ সেন্টিমিটার কমে এখনো বিপদসীমার ১২১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার কারণে ইসলামপুরের ৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

ওইসব পানিবন্দিদের মাঝে রান্নাকরা খাবারের তীব্র সংকট চলছে। এ উপজেলার দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে নৌকায় ঘুরে দেখা গেছে, ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী, চিনাডুলি, নোয়ারপাড়া, বেলগাছা, কুলকান্দি ও পাথর্শী ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়িতেই তিন ফুট থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত বন্যার পানি উঠেছে। এ উপজেলার দেড় লক্ষাধিক বন্যার্তদের অধিকাংশরাই নিজ বাড়িঘর ছেড়ে আশপাশের উঁচু রাস্তায় মাচা পেতে এবং ব্রিজের উপর আশ্রয় নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ইসলামপুরের পানিবন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন যমুনা তীরবর্তী বাড়িঘরের মানুষগুলো। তাদের কারো বাড়িঘর বন্যার তীব্র স্রোতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। অনেকেরই বাড়িঘর বন্যার তীব্র স্রোতে ভেসেও গেছে।

ইসলামপুরের সাপধরী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে ওই ইউনিযনের প্রায় ১ হাজার মানুষ বন্যার তীব্র স্রোতের কারণে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে মন্ডল পাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সেখানে আশ্রয় নেয়া চান মিয়া প্রামানিক, মোস্তাফিজুর, বুদু মন্ডল, মতি প্রামানিক ও সিদ্দিক প্রামানিকের সাথে কথা হলে তারা জানান, তাদের প্রত্যেকের বাড়িঘরে তিন ফুট থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত পানি হওয়ায় তারা বাড়িঘর ছেড়ে ওই প্রকল্পে আশ্রয় নিয়েছে।

সেখানে প্রত্যেকের মাঝে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করায় তাদের মাঝে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। ওই সময় মোস্তাফিজুর প্রামানিক বলেন, ভাই আপনেরা কোন ইলিফ (ত্রাণ) আনছেন। এহন না খেয়ে মরতাছি। পরে ইলিপ দিয়ে কি হইবো?

নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের মশামারী, হাড়গিলা, করিতাইড়, তাড়তাপাড়া, উলিয়া ও সোনামুখি গ্রামসমূহে গিয়ে দেখা গেছে ওইসব গ্রামের পানিবন্দি মানুষগুলো নিজ বাড়িঘরের কাছে উলিয়া-মাহমুদপুর সড়কের জিন্নাখালি ব্রিজ, করির তাইর ব্রিজ ও উলিয়া পাইলিংঘাটে গরু-বাছুর নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের কারো বাড়িতেই রান্না করে খাবার জো নেই।

ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম জানান, তার ইউনিয়নের দেওয়ানপাড়া, শিংভাঙ্গা, বামনা, গিলাবাড়ি, বলিয়াদহ গ্রামের সহস্রাধিক বাড়িঘরে ৬ ফুট পর্যন্ত পানি হওয়ায় ওইসব বাড়িঘরে কোন মানুষ নাই। ওই এলাকার শতাধিক ঘরবাড়ি বানের পানির তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। এসব বাড়ি ঘরের মানুষগুলো বিভিন্ন ব্রীজ ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয়  নিয়েও পনিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে।

ইসলামপুরের পাথর্শী ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আলম বাবুল জানান, তার ইউনিয়নের শ্বশারিয়াবাড়ি, মুরাদাবাদ, পাথর্শী, জারুলতলা, হাড়িয়াবাড়ী ও মুখশিমলা গ্রামসমূহের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছে। বন্যার কারণে মুরাদাবাদ গ্রামের ৫টি পাকা বাড়ি ধ্বসে পড়েছে এবং শতাধিক বাড়িঘর বন্যার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। এই ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার মানুষ মলমগঞ্জ হাইস্কুল, হাড়িয়াবাড়ী হাইস্কুল, মলমগঞ্জ কলেজ, এলাকার বিভিন্ন উঁচু রাস্তা ও ব্রিজের উপর আশ্রয় নিয়েছে।

বেলগাছা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানান, তার ইউনিয়নে মন্নিয়া, শিলদহ, সিন্দুরতলী, বরুল, জারুলতলা, মাঝপাড়া, ধনতলা ও ঘোনাপাড়া গ্রামসমূহের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ইউনিয়নে  মন্নিয়া, শিলদহ, সিন্দুরতলী ও বরুল গ্রামের প্রায় ৫ শতাধিক বাড়িঘর যমুনার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম এহছানুল মামুন জানান, ইসলামপুরের ৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। এসব পানিবন্দিদের মাঝে ২৭ মেট্রিক টন চাল ও ৬ শ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ইসলামপুরের ২৪টি পয়েন্টে বুধবার দুপুর থেকে খিচুড়ি রান্না করে বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।


মন্তব্য