kalerkantho


জাহাজ্জ্যার চরে সোনালী আলোর ছটা

আবুল কাশেম হৃদয়, স্বর্ণদ্বীপ থেকে    

১৭ জুলাই, ২০১৭ ২১:৫১



জাহাজ্জ্যার চরে সোনালী আলোর ছটা

এক সময় নাম ছিল জাহাজ্জ্যার চর। বড় একটি জাহাজ নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কাছে এ চরটিতে দুর্ঘটনায় আটকে যায়।

সেই থেকে নাম জাহাজ্জ্যার চর। সাইক্লোন ও জলোচ্ছাসের ঝুঁকিতে থাকা প্রত্যন্ত এ চরাঞ্চল ছিল ডাকাতদের অভয়ারোণ্য। সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে অন্তত দুই মিটার উঁচু এ চরে ১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ এর ঘূর্ণিঝড়ে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে সাত ফুট জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল।

স্থানীয়দের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলা এবং সামাজিক বনায়নের জন্য ২০১৩ সালের ৮ মার্চ এটি হস্তান্তর করা হয় সেনাবাহিনীর কাছে। তারপর থেকে এই জাহাজ্জ্যার চরে উঁকি দিতে থাকে সোনালী সূর্য। জাহাজ্জ্যার চরের নাম হয়ে যায় 'স্বর্ণদ্বীপ'। এই স্বর্ণদ্বীপে সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প 'স্যাপার্স ক্যাম্প'। সরকারি সহায়তা পেলে এই স্যাপার্স ক্যাম্প হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম আধুনিক সেনা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প।

জানা গেছে, নোয়াখালীর সূবর্ণচরের কাটাখাল থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনার প্রায় ছয় কিলোমিটার সাগরপথ পাড়ি দিয়ে জনবসতিহীন বিশাল এ স্বর্ণদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৩ পদাতিক ডিভিশন ও কুমিল্লা এরিয়ার হাতে।

সরকারের সহায়তায় ও সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় চরটিকে আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে দ্বীপটি এশিয়ার মধ্যে সেরা ও আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সেনাবাহিনী।

কুমিল্লা থেকে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আজ সোমবার বিকেলে দ্বীপটিতে পৌঁছায়। দ্বীপের উন্নয়ন সম্ভাবনা আদ্যপ্রান্ত নিয়ে আজকের এ প্রতিবেদন।

জানা গেছে, দুর্গম এ চরাঞ্চলে ক্যাম্প নির্মাণের দুঃসাহসিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের একটি দল প্রথম ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ এ চরাঞ্চলে পদার্পণ করে। ৭ আরই ব্যাটালিয়নের সার্বিক সহায়তার এলসিটিযোগে পরবর্তীতে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ার ইউনিটসমূহের প্লান্ট ভারি সরঞ্জামাদি ও  জনবল চরটিতে মোতায়েন করে। বিরূপ আবহাওয়া মোকাবেলা করে ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের দুঃসাহসী স্যাপার্সরা ক্যাম্প নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেন। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা এবং সকল বাধা বিপত্তিকে জয় করে সদর দপ্তরের ৩ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক নির্দেশনায় এবং টাস্কফোর্স সদর দপ্তর ৩৩ আর্টিলারি ব্রিগ্রেডের তত্ত্বাবধানে ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের স্যাপার্সরা  ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর ক্যাম্প নির্মাণের কার্যক্রম সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

ক্যাম্প নির্মাণের সময় স্যাপার্সরা ২০ ফুট উঁচু (আনুমানিক ৩০০০.০০ সিএফটি) মাটিভরাট বাঁধ নির্মাণ 'এল' আকৃতির লেক এবং পুকুর খনন, সেনাসদস্যদের আবাসনের জন্য রিফারবিকা কন্টেইনার স্থাপন, স্টার কন্টেইনার স্থাপন, সৈনিক ব্যারাক নির্মাণ, সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, ডাইনিং হল এবং কুক হাউজ নির্মাণ, এটিভি শেড নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, হাসমুরগি ও মহিষের খামার নির্মাণ এবং দুইটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করে। মূল ক্যাম্প নির্মাণের পাশাপাশি ক্যাম্পের রক্ষণাবেক্ষণ উন্নয়ন ও অন্যান্য সুবিধাদি নির্মাণের কাজে প্রতিনিয়তই চলছে এখানে। এ ছাড়া নিয়োজিত সেনাসদস্যরা সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করা হয়। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ৮ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সৈনিক নম্বর ১৪৪৮৮৫৬ সৈনিক মো. আ. রহিম কর্তৃক চালিত ড্রেজার দ্বারা রাস্তা নির্মাণের সময় ড্রেজারের আঘাতে জলদস্যুদের ভূগর্ভস্থ একটি অস্ত্র ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে ৬ বীর এর একটি টহলদল ও ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা ওই অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে  ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮২টি রামদা, বিপুল পরিমাণ ট্রিপফ্লেয়ার উদ্ধার করেন।

সূবর্ণচরের কাটাখাল থেকে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রাধীন একটি ট্রলারে করে স্বর্ণদ্বীপ আসার পথে ট্রলারের মাঝি আজাদ মিয়া ও ট্রলারের লস্কর আবুল হাশেম জানান, আনুমানিক ২০-২৫ বছর আগে আজকের স্বর্ণদ্বীপ এলাকায় একটি জাহাজ চরে আটকে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। ওই সময় থেকে এ চরটি জাহাজ্জ্যার চর নামেই এতদাঞ্চলের মাঝে পরিচিতি পায়। মাঝি ও লস্করদ্বয় আরো জানান, নোয়াখালীর সূবর্ণচর  ও হাতিয়ার দুর্ধর্ষ ডাকাত-জলদস্যুরা ডাকাতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে  জাহাজ্জ্যার চরে আত্মগোপন করত। এ ছাড়া ডাকাতদল সাগরপথে যাতায়াতকারী জাহাজের মালামাল লুটপাটসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নিরীহ মানুষজন, জেলে ও নারীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করত। জাহাজ্জ্যার চরকেন্দ্রীক ডাকাত-জলদস্যু সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে উপকূলবাসী ছিল দিশেহারা। প্রায় সাত বছর আগে র‌্যাবের অভিযানে জাহাজ্জ্যার চরের ত্রাস বাশার মাঝি নিহত হয়। ওই সময় র‌্যাব জাহাজ্জ্যার চর থেকে ডাকাতদের ব্যবহৃত বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্বার করে। পরে সেনাবাহিনী এ চরে অবস্থান নিয়ে ডাকাত-সন্ত্রাসী ও জলদস্যুদের আস্তানা গুড়িয়ে দেয় এবং ডাকাতদের ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাাবারুদ উদ্ধার করে।

স্থানীয়রা জানায়, সেনাবাহিনী এ দ্বীপের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী ও জেলেরা স্বাভাবিক জীবনযাপনসহ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এতে এসব এলাকার লোকজনের নিরাপত্তা ও জীবনমানের পরিবর্তন হচ্ছে। চরে আসার সময় সাগরপথে ট্রলারে বসে কথা হয় সেনাবাহিনীর ২৮ মিডিয়াম রেজিমেন্ট আর্টিলারির মেজর তাওহীদুল ইসলাম সাথে। তিনি জানালেন, ২০১৩ সালের ৮মার্চ সেনাবাহিনী চরটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড শুরু করে এবং ২০১৪ সালের ২ এপ্রিল এ চরে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া মাটির নিচ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে।

স্বর্ণদ্বীপ টাক্সফোর্স সদর দপ্তরের সমন্বয়কারী কর্মকর্তা সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোরের মেজর মুর্শিদুল আজাদ জানান, দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে এ দ্বীপটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। দ্বীপটিকে দেশের আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিবছর ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সাতটি ব্রিগেড গ্রুপ এখান থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকে। প্রতি ব্রিগেডে দুই হাজার করে সেনা সদস্য থাকেন। এ পর্যন্ত ২০১৪ সালে একটি, ২০১৫ সালে পাঁচটি, ২০১৬-১৭ সালে আটটিসহ ১৪টি গ্রুপ সফলভাবে বৃহৎ আকারে সফলভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এ ছাড়া সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা ও প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি আরো জানান, ৩৭০ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল এ দ্বীপটিতে ৬০ হাজার ঝাউগাছ, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ভিয়েতনামের ১৫০০ সিয়াম নারকেলের চারা ও ১৭০০ ফলদ গাছ লাগানো হয়েছে। চারদিকে সাগর ও সাগর মোহনা পরিবেষ্টিত দ্বীপটিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ। সেনাবাহিনী দ্বীপটির দায়িত্বভার গ্রহণ করে মহিষ, হাঁস, মুরগি, ভেড়া পালন শুরু করে। মহিষের দুধের পনিরের কারখানা স্থাপন করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। সরকারের আরও সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে স্বর্ণদ্বীপ হবে এশিয়ার অন্যতম ও আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

মেজর মুর্শিদুল আজাদ আরও জানান, সেনা সদরের প্রস্তাবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দ্বীপটি সফরকালে দ্বীপটির নাম জাহাজ্জ্যার চর থেকে স্বর্ণদ্বীপ নামে নামকরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, আগামীকাল মঙ্গলবার বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু স্বর্ণদ্বীপের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড  পরিদর্শন করবেন। এ সময় ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং কুমিল্লা এরিয়ার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল রাশেদ আমিনসহ সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।


মন্তব্য