kalerkantho


জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে উপকূলে সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ মার্চ, ২০১৭ ১০:১২



জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে উপকূলে সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে

'আগে বাড়িতে অতিথি আসলে ভাত খেতে দিতে পারলেও খাবার জল দিতে পারতাম না। দুই কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে জল আনতে হতো। সারাদিন দিনমজুরি শেষে অতিরিক্ত জল আনতে খুবই কষ্ট হতো। আইলার পর ওই পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেই কষ্ট আরো বেড়ে যায়। ' কথাগুলো বলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ফুলতলা গ্রামের দিপালী মন্ডল।

সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের হামলায় দিপালীর স্বামী নিরঞ্জন মন্ডলের মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১২/১৩ বছর আগে। সেই থেকে তার দুই সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামের শুরু। দিনমজুরি করে বা খালে বিলে কাঁকড়া ধরে তার জীবন চলে। সারাদিন পানির কাছাকাছি থাকলেও খাবার পানির জন্য তাকে কঠিন কষ্ট করতে হতো। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় বায়ো সেন্ড ফিল্টার পেয়ে সেই কষ্ট কিছুটা কমেছে। তবে দিপালী মন্ডলের কষ্ট কমলেও শ্যামনগরসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে বিশ্বে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পানির চাহিদা। উন্নত জীবনযাপনের প্রয়োজনেও মানুষের দৈনিক মাথাপিছু পানির চাহিদা বেড়েছে আরো খানিকটা। কিন্তু নানামুখী অপচয় ও বিভিন্নমুখী হস্তক্ষেপের কারণে অনেক স্থানে সুপেয় পানির উৎস সংকুচিত, দূষিত এবং ধ্বংস হচ্ছে। ফলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এই সংকট সব থেকে বেশি। ওই এলাকায় গড় হিসেবে ২৫২ জনের জন্য একটি নলকূপ থাকলেও অনেক উপজেলায় নলকূপের অস্তিত্ব নেই। সেখানে পুকুর বা অন্য জলাশয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। ওই সকল এলাকায় সিডর ও আইলার মতো প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক জলাশয় নষ্ট হয়েছে। ফলে সুপেয় পানির সংকটও বেড়েছে।

বেসরকারি সংস্থার একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইলা দুর্গত এলাকার ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন বিশুদ্ধ পানির অভাবে রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নে বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ নলকূপের মাধ্যমে পানি পাচ্ছে। বাকিদের পানি সংগ্রহের জন্য গড়ে ২ থেকে ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে হচ্ছে। এখনও ৭৮ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সেখানে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ পুকুর নোনা পানিমুক্ত আছে।

এ বিষয়ে নেটওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বাংলাদেশ (এনসিসিবি) ট্রাস্টের কো-অর্ডিনেটর মিজানুর রহমান বিজয় কালের কণ্ঠকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকটগুলোর অন্যতম সুপেয় পানির সংকট। উপকূলীয় এলাকায় এই সংকট সব থেকে বেশি। কারণ সেখানে সুপেয় পানির আধার এমনিতেই কম। এরপর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই আধারগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এই সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে সিডর, আইলা, নার্গিস, বিজলীসহ মোট ৫টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। এতে মিষ্টি পানির আধার নষ্ট ও ভূ-উপরিভাগে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। যা আগামীতে আরো বেশি সংকট তৈরি করবে।

সাতক্ষীরা-খুলনা এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘ দিন কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা লিডার্স (লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্স সোসাইটি)। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাবার পানি সংকটের জন্য লবণাক্ততাকে দায়ী করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এরপর অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষে পুকুর ও অন্যান্য জলাধানগুলো লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট বেড়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের তীরঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ২১৬টি গ্রামের ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষের অধিকাংশই সুপেয় পানি সংকটে আছেন বলে জানান লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, ওই এলাকার মানুষকে খাবার পানির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। খাবার পানি জোগাড় করতে গ্রামের মহিলাদের দুই থেকে ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। দিনের একটি বড় সময় এর পেছনে ব্যয় করতে হয়। তবে এই সংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যে বায়ো সেন্ড ফিল্টার, পিএসএফ (পুকুর পাড়ে বালির ফিল্টার) ও রেইন ওয়াটার হারর্ভেস্টিং প্লান্ট এবং জলাধার সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

লিডার্সের প্রগ্রাম অফিসার মো. শওকত হোসেন জানান, লিডার্সের পক্ষ থেকে গত এক বছরে ১০৫০টি বায়ো সেন্ড ফিল্টার, ৮৪টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট ও ৫টি ডিপটিউবওয়েল স্থাপন এবং ১১০টি পুকুর ও জলাশয় সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্যামনগরসহ উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্নভাবে সামান্য পরিমাণ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করলেও সেটি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বয়হীনতা ও মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। ফলে এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও তার সুফল পাচ্ছে না ভুক্তভোগী জনগণ। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো বেশি কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। তিনি আরো বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এলাকার মিষ্টি পানির পুকুরগুলো সংস্কার করে সেই পুকুর যাতে কোনোভাবেই নোনা পানিতে প্লাবিত না হয় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ সুপেয় পানির বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে।


মন্তব্য