kalerkantho


যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি খন্দকার ম. হামিদ রঞ্জু

আমার গর্ব আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমার দু:খ মুক্তিযুদ্ধে আমি শহীদ হইনি

তায়েফুর রহমান, সাভার   

১০ মার্চ, ২০১৭ ১৪:২৬



আমার গর্ব আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমার দু:খ মুক্তিযুদ্ধে আমি শহীদ হইনি

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনকর্তাদের বৈষম্যমূলক আচরণ সম্পর্কে আগেই অবগত ছিলেন সাভারের গেন্ডা মহল্লার খন্দকার আব্দুল মজিদ ও ইয়াকুত নেছা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান খন্দকার ম. হামিদ রন্জু। ১৯৭১ এ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তেন সাভার কলেজে। সবসময়ই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ছিলেন ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় সদস্য। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন একজন গর্বিত সদস্য। ভাষা আন্দোলনের সময় ছয় বছরের একজন শিশু হওয়ায় সে আন্দোলনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। তবে ভাষা শহীদদের স্মরণে তখন শহীদ মিনার নির্মাণ পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ থাকলেও ১৯৬৮ সালে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বর্ণময়ী ছাত্রাবাসের সামনে রাতের অন্ধকারে হারিকেন জ্বালিয়ে সাভারে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি ছিলেন প্রধান এবং অগ্রণী ভূমিকায়।

কালের কণ্ঠের সাথে আলাপচারিতায় খন্দকার ম. হামিদ রন্জু বলেন, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণীঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের খবর ঢাকার রেডিওতে শুনতে না পেয়ে তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মে পাকিস্তান সরকারের প্রতি।
এছাড়া, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় তাঁকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে। তখন চার খলিফা হিসেবে পরিচিত আসম আব্দুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সঙ্গে তাঁর তৈরি হয়েছিল একটি নিবিড় সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে আসম আব্দুর রব আগেই দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে একটি ধারনা দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘নিউক্লিয়ার’ বডিতে তাঁকে একজন সদস্য করে নেন।

তখন থেকেই তিনি ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতি।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জ্বালাময়ী বক্তব্য এবং আ স ম আব্দুর রবের সরাবরি বক্তব্য স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে দারুনভাবে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। এর আগেই তিনি ১ মার্চ থেকে স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ডামি রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করে দেন। ২ মার্চ আ স ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ওই দিনই তিনি (খন্দকার ম. হামিদ রনজু) আ স ম আব্দুর রব- এর সাথে দেখা করে সাভারেও স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের অনুরোধ জানান। ৫ মার্চ তিনি সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরো কয়েকজন মিলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। এর আগে ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে শাজাহান সিরাজ তৎকালীন পল্টন ময়দানে (আউটার স্টেডিয়াম) স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করেন। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভায় সর্বস্তরের জনসাধারণকে উপস্থিত করার জন্য সাভার এলাকায় প্রচারের দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। তখন ডামি রাইফেল প্রশিক্ষণ ও প্রচার কাজ চলতে থাকে সমান তালে।
মুডির টিনের মতো একটি বাসযোগে তিনি ৭ মার্চ সাভার থেকে একদল কর্মীবাহিনী নিয়ে সকাল ১১টার দিকে  বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগ দেন। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সময় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন সেই মঞ্চের নিরাপত্তা বেস্টনির ভিতরে। তিনি বলেন, একটি সাদা রংয়ের টয়োটা গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তখন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে বক্তব্যরত একজনকে বা হাত দিয়ে সরিয়ে নিজে মাইক নিয়ে কাউকে কোনো সম্বোধন ছাড়াই দরাজ গলায় বলে উঠলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দু:খ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের কাছে হাজির হয়েছি...............’ বঙ্গবন্ধুর জাদুকরি এই ভাষণ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মোহিত করে। এই বক্তব্য শুনার পর তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে সাভারের ১২টি ইউনিয়নে ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতার সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে লোকজনকে সংগঠিত করতে থাকেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে লোকজনকে সংগঠিত করার কাজ। ২৫ মার্চ কাল রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইট চলার পর সাভারে যেন পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য তিনি কয়েকজন যুবককে নিয়ে তৎকালীন মিরপুর লোহার ব্রিজটি (আমিনবাজার ব্রিজ) বুলড্রুজার, কাঠের গুড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। বলিয়ারপুর ও হেমায়েতপুরেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গাছ কেটে ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। বাইপাইল মোডে ব্রিজ নির্মাণের জন্য রাখা সামগ্রী দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাটে বন্ধ করে দেন ফেরি চলাচল। এই প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে মীরপুর ব্রিজ হয়ে জিপ নিয়ে ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সাভারে প্রবেশ করে। তখন সাভার থানার তৎকালীন ওসি আব্দুল মজিদ স্বাধীনতার পক্ষের লোক হলেও তাঁকে এবং তাঁর সহযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান ইমুকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। না হলে তাঁদেরকে গ্রেপ্তারেরও ভয় দেখান। অতপর তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান ইমু এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি আট জন যুবককে সংগ্রহ করে এবং সাভারের মোজাম্মেল হক ও আব্দুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ১২ এপ্রিল ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কসবা হয়ে ভারতের বক্সনগর থানায় প্রবেশ করেন। এরপর ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেও কোন প্রশিক্ষণের সুযোগ না পেয়ে মনোকষ্টে ভ’গতে থাকেন। দুবেলা খাবারেরও সুযোগ মিলে না তাদের। পরে তিনি মাজাম্মেল হক ও আব্দুল কাইউমকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন আগরতলায়।
পূর্ব সম্পর্কের সূত্র ধরে সেখানে তাঁরা দেখা করলেন আ স ম আব্দুর রবের সঙ্গে। পরদিনই আ স ম আব্দুর রব ভারতীয় একটি কার্গো বিমানযোগে তাদের তিনজনকে প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে দুই মাস কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর তারা আগস্টের শেষ সপ্তাহে বেশ কিছু অস্ত্র এবং গোলাবারুদ নিয়ে ফিরে এলেন সাভার। কিন্তু সাভারের অবস্থান ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় এখানে পাকিস্তানি আর্মিদের যাতায়াত ছিল অবাধ। তাই এখানে কোনো ক্যাম্প করার সুযোগ না পেয়ে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানার রায়দক্ষিণ গ্রামে গিয়ে বিরাট বাহিনী গড়ে তোলেন। সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। তবে ছোটখাটো কিছু ঘটনা ব্যতীত এই এলাকায় বড় কোনও যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি বিধায় তাঁর বড় কোনও যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি।
স্মরণীয় ঘটনার ব্যাপারে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি একটি রাইফেল সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় চাপাইন ও ডেইরি ফার্ম এলাকা হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকেীশলী আব্দুল গফুরের বাসায় যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর একজন দালাল তাঁকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় রেডিও ট্রান্সমিশন অফিসে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে খবর দেয়। খবর পেয়ে তারা সেখানে এসে তাঁকে না পেয়ে অহেতুক ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। তখন তিনি পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে শুয়ে পড়েন।
পাকিস্তানি আর্মি চলে গেলে তিনি আব্দুল গফুরের বাসায় চলে যান। কিন্তু এরই ভিতর তাঁর বাড়িতে খবর চলে যায় যে তিনি পাকিস্তানি আর্মিদের গুলিতে মারা গেছেন। বাড়িতে সকলে তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পরদিন পাকিস্তানি বাহিনী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-সহকারী প্রকেীশলী আব্দুল গফুরের বাসায় তাঁর অবস্থানের খবর পেয়ে অভিযানে আসলেও বাসার ভিতর প্রবেশ না করে গফুরের কথায় চলে যায়। সেদিনও তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি তিন রাজাকার সদস্যকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। তাদের কাছ থেকে তিনি তিনটি রাইফেল ও ৪৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেন।
তিনি বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, সে স্বপ্ন থেকে আমরা এখন অনেক দূরে। আমার গর্ব- আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আর আমার দু:খ- মুক্তিযুদ্ধে তখন আমি শহীদ হইনি। ’

 


মন্তব্য