kalerkantho


খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার

আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার একটি গ্রাম বিধ্বস্ত

শিমুল চৌধুরী, ভোলা    

৬ মার্চ, ২০১৭ ১৮:৩৬



আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার একটি গ্রাম বিধ্বস্ত

আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামের হাজার হাজার পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে। ঘূর্ণিঝড়ে তাদের অনেকের ঘরের চাল উড়ে গেছে মাইলের পর মাইল দূরে।

অনেক ঘরের চাল গাছে ঝুলতে দেখা গেছে। অনেকের একমাত্র ব্যবসায়ীর সম্বল মুরগির খামার ধ্বংস হয়ে গেছে। দুই জেলের ঘর মাটির সঙ্গে মিছে গেছে। তারা এখন অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক বিধ্বস্ত ঘরের ওপরে রোদে শুকাচ্ছেন ভিজে যাওয়া লেপ-তোষক, বালিশ, বই-খাতা।

এসব দরিদ্র পরিবারের কারোরই ফের ঘর তোলার সামর্থ্য নেই। তাই অসহায় হয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তারা। অনেকে মিস্ত্রি দিয়ে ঘর মেরামত কাজ করাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার নিজের পরিবার নিয়ে বিধ্বস্ত ঘর মেরামতের চেষ্টা করছেন।

গতকাল রবিবার বিকেলে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ওই গ্রামের শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়। ঘর চাপা পড়ে আহত হন অন্তত ১৫ জন। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ পড়ে বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎসংযোগ। এতে রাতের বেলা  গ্রামজুড়ে ভুতুরে পরিবেশ বিরাজ করছে।

আজ সোমবার দুপুরে বিধ্বস্ত ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রাম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ধ্বংসস্তুপের পাশে দাঁড়িয়ে, কেউবা বসে রয়েছেন। তাদের চোখেমুখে কেবল হতাশার ছাপ। পথে পথে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। চোখের সামনে ব্যবসায়ীর একমাত্র সম্বল মুরগির খামারটি চুরমার দেখে যেন অনেকটা নির্বাক হয়ে পড়েছেন ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামের ৫  নম্বর ওয়ার্ডের দিনমজুর আলমগীর হোসেন। তার চোখেমুখে হতাশার ছাপ।
আলমগীর জানান, রবিবার বিকেলে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় এসে তার খামারটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। খামারে ৩০০ মুরগির বাচ্চা ছিল। ঝড়ে শতাধিক মুরগির বাচ্চা মরে গেছে। গত এক মাস আগে তার ঘরের পাশেই ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে মুরগির খামারটি করেছিলেন বলে জানান তিনি। বসতঘরটি অক্ষত থাকলেও মুরগির খামারটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। স্থানীয় ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন তার বিধ্বস্ত খামারটি সরেজমিনে দেখে তালিকা তৈরি করে গেছেন।

ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন জানান, আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে আলমগীরের মুরগির খামারসহ তার ওয়ার্ডেই ৭৫-৮০টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। আলমগীরের ঘরের পাশেই আজিজুল বেপারী ও শহিদ সরকারের ঘর দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে গেছে।

আজিজুল বেপারীর ঘরের চাল পাশের একটি গাছে ঝুলতে দেখা গেছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মিঝি বাড়ির ব্যবসায়ী ইউছুফ হোসেনকে মিস্ত্রি দিয়ে ঘর মেরামতের কাজ করাতে দেখা গেছে। ইউছুফ জানান, তার ঘরটি রবিবার বিকেলে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত  হওয়ার পর আজ সোমবার সকালে ঘরটি মেরামত করছেন তিনি। ওই এলাকার গিরিঙ্গী বাজাারের কয়েকটি দোকানসহ প্রায় ১৫টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিধ্বস্ত  ঘরের ভেতরে হাত-পা গুজে বসে রয়েছেন অটোরিকশা চালক সবুজ ও তার স্ত্রী বিবি মরিয়ম। সবুজ বলেন, "তিন মাস আগে একটি ঝড়ের সময় গাছ পড়ে আমার এ ঘরটি ভেঙে যায়। ধার-দেনা করে স্থানীয়দের সহায়তায় নতুন করে ঘরটি মেরামত করেছিলাম। কিন্তু আবার রবিবার ঘূর্ণিঝড় এসে আমার ঘরটি পুনরায় ভেঙে দিয়ে গেল। আমি এখন কি করমু, কেমনে ঘর করমু ভেবে পাই না। "

সবুজ জানান, ঘূর্ণিঝড়ে তার ঘরসহ পাশাপাশি তার ভাই ইউছুফ ও তার মা নুর নাহারের ঘরও ভেঙে গেছে। তারা সবাই এখন হতাশাগ্রস্ত। একই গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই জেলে নুরু মাঝি ও আব্দুল মন্নানের ঘর দুইটি নিশ্চিহ্ন করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়টি। এদের মধ্যে নুরু মাঝির ঘরটি ভেঙে ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে প্রায় এক মাইল দূরে বিলের মাঝে ফেলে দিয়েছে। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা চাল এনে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছেন। নুরু মাঝির স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, "আমার স্বামী নদীতে মাছ ধরে। নদীতে মাছ ধইরাই আমাগো চার  পোলা-মাইয়ার সংসার চলে। নদীতে আবার অহন অভিযান দিছে। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। সরকার আমাগো কোনও টাকা-পয়সা দেয় নাই। অহন আবার ঝড়ে আমাগো সব শেষ কইরা হালাইছে। আমরা অহন খোলা আকাশের নিচে। আমরা অহন কেমকে ঘর উডাইমু। " তিনি আরো বলেন, "সরকার যদি আমাগো সহযোগিতা করে তাইলে ঘর উডাইতে পারমু, নাইলে ঘর উডাইতে পারমু না। "

আব্দুল মন্নানের ঘর ভেঙে চাল উড়িয়ে পাশের পুকুরের ভেতরে ফেলে দিয়েছে ঘূর্ণিঝড়। মন্নানের মা রানু বিবি ও বোনরা মিলে সেই পুকুর থেকে চাল উঠিয়ে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্র ওজোপাডিকোর উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি দল মাঠে কাজ করছে। তারা বিচ্ছিন্ন ও ছিড়ে যাওয়া তার মেরামত করে ওই গ্রামে ফের বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্র ওজোপাডিকোর উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদ জানান, সোমবারের মধ্যেই ওই গ্রামে বিধ্বস্ত তার মেরামত করে বিদ্যুৎসংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

ঘূর্ণিঝড়দুর্গত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী  কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম সোমবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, "ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামের বেশ কিছু ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। " তিনি বলেন, "ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যেকের জন্য নগদ ৫০০ টাকা ও ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। " বরাদ্দকৃত চাল ও টাকা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বারদের মাধ্যমে দ্রুত বিতরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।    

 


মন্তব্য