kalerkantho


দেড় বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলেছেন রাজাকার রইস!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৪:১৪



দেড় বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলেছেন রাজাকার রইস!

স্বাধীনতার পর থেকে এলাকায় পরিচিত ছিলেন রাজাকার হিসেবে। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। স্বাধীনতার আগে ছিলেন মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী। অথচ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের খাতায় নাম রয়েছে তার। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রায় দেড় বছর ধরে ভাতাও তুলেছেন তিনি।

গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় স্থান পাওয়া এই অভিযুক্ত রাজাকারের নাম রইস উদ্দিন আহমেদ (৬৫)। বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের পলাশী গ্রামের মৃত হাবিবুল্লার ছেলে তিনি। মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তার নম্বর ১০৫৪২। সম্প্রতি জেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি তাকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশও পাঠিয়েছে কমিটি।

কমিটির সদস্যসচিব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ অতুল মণ্ডল বলেন, "যাচাই-বাছাই কমিটিতে রইসের নাম ডাকা হলে উপস্থিত সবাই একবাক্যে বলে ওঠেন, রইস একজন রাজাকার। এরপর কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, তাকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রইসের সব স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে তাকে দেওয়া সব সুবিধা ফেরতেরও সুপারিশ করা হয়েছে। "

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিবাহিনীর বহু অস্ত্র রাজাকারদের হাতে তুলে দেওয়ায় রইসের আপন দুই ভাই ইউনুস ও আব্দুল মান্নান এবং তাদের মামাতো ভাই দেলোয়ারের প্রাণ যায় মুক্তিবাহিনীর হাতে। কিন্তু ওই সময় মুক্তিযোদ্ধারা রইসের বাড়ি ঘেরাও করলেও ঘরের বেড়া ভেঙে হরিহর নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান রইস। এরপর এলাকা ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালীতে চলে যান তিনি। সেখান থেকে তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ শুরু করেন। চাকরি শেষে আবার তিনি ফিরে আসেন যশোরের নিজ এলাকায়।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল জানায়, ২০০৩ সালে গেজেটভুক্ত হয়ে ২০০৫ সালের দিকে রইস উদ্দিন একটি সাময়িক সনদপত্র পান। এরপর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উঠিয়েছেন।

রোহিতা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লেয়াকত আলী বলেন, "রইস শুধু রাজাকারই না, সে এতটাই খারাপ ছিল যে তার মতের বাইরে কেউ গেলে তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করতো সে। এখনও এলাকার মানুষ তাকে ভয় পায়। তার শ্বশুর সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার হাত ধরে রইস মুক্তিযোদ্ধার কার্ড করিয়েছে রইস। "

রোহিতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, "রইস চিহ্নিত রাজাকার। টাকার বিনিময়ে সে মুক্তিযোদ্ধার কার্ড করিয়েছে। সে যদি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ভাতা পায়, তাহলে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কিত করা হবে। "

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত রইস উদ্দিন বলেন, "মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে গেছে তারা আমার কাছে তাদের গরু-ছাগল রেখে যায়। আমি সেগুলো বেচে তাদের কাছে টাকা পাঠাতাম। যুদ্ধের সময় স্থানীয় একটি কোন্দলকে কেন্দ্র করে এক রাতে চার-পাঁচজন মুখোশধারী লোক আমার বাড়ি আক্রমণ করলে ঘরের বেড়া ভেঙে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমি পালিয়ে যাই। তারপর নোয়াখালীতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে ভারতের আসামে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেখানকার কাগজপত্র জমা দিয়ে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাই। "

রইস উদ্দিন আরও বলেন, "১৯৭১ সালের জুলাইয়ের শেষের দিকে নোয়াখালী যাই। এরপর আগস্ট মাসে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেই। ওই মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতে যাই। সেপ্টেম্বরে ভারত থেকে নোয়াখালীতে এসে ওয়ালি উল্লাহর নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেই। এরপর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসি। "

 

 


মন্তব্য