kalerkantho


জামালপুরে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে সেচ সংকট

আজিজুর রহমান চৌধুরী,জামালপুর    

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১২:১৫



জামালপুরে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে সেচ সংকট

জামালপুরে এ বছর বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই পল্লী বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। এতে সেচযন্ত্র চালাতে না পারায় পানির অভাবে চলতি মৌসুমের বোরো ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে।

শিগগির সেচ দিতে না পারলে ধান গাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

অভিযোগে জান গেছে, জামালপুরের সাতটি উপজেলায় সেচ সংকটে পড়েছেন পাঁচ লক্ষাধিক কৃষক। এ বছর বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই টানা ২০ মিনিটও বিদ্যুৎ স্থায়ী হয় না। দুই তিন ঘণ্টা পরপর হঠাৎ বিদ্যুতের আলো দেখা গেলেও ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যায়। গ্রাহকরা গত চার সপ্তাহ ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। বিদ্যুতের অভাবে সেচযন্ত্র চালাতে পারছেন না কৃষকরা। পানির অভাবে চলতি মৌসুমে বোরো ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। শত শত একর বোরো ক্ষেতে পানির সংকট চলছে। অনেকেরই বোরো ক্ষেত শুকিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে।

অপরদিকে বিদ্যুতের ঘনঘন দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে শিল্পকারখানাসহ ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও অচল হয়ে পড়েছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার খামখেয়ালিপনায় গ্রাহকদের টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলায় দিনে ২১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে বলে স্থানীয় গ্রাহকরা জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে তাও বলতে পারছে না খোদ জামালপুরসহ স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

জামালপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর সদর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, সরিষাবাড়ী, বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় এ বছর এক লাখ ২৭ হাজার ৫১৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৯৪৬ জন কৃষক বোরো চাষ করছেন। এদিকে, জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৮ মেগাওয়াট।

বকশীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বকশীগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী ইসলামপুর উপজেলার কিছু অংশে এখান থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়। বকশীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে তিন হাজার ৫১৪টি বাণিজ্যিক, সেচপাম্প এক হাজার ৩৫টি, ভারি শিল্প ১০টি, শিল্পকারখানা ৩২৫টি এবং  বাকিগুলো সাধারণ গ্রাহক। এখানে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ মেগাওয়াট। কিন্তু তিন সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র তিন মেগাওয়াট।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের নয়া মালমারা, নাপিতের চর, আগুনের চর, বলিদাপাড়া মরাকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের অভাবে বোরো ধানের ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ইসলামপুরের কাছিমারচর গ্রামের সাইফুল ইসলাম ও একই উপজেলার মালমারা গ্রামের আব্দুস ছালাম জানান, বিদ্যুতের অভাবে তারা সেচযন্ত্র চালাতে পারছেন না। এতে বোরোচাষ ব্যাহত হচ্ছে।

বকশীগঞ্জের কোহিনূর এমদাদ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমদাদুল হক জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানার মেশিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন করা যাচ্ছে না। কয়েক শ কর্মচারীকে বেতন দিয়ে উৎপাদন করতে না পারলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। বকশী উপজেলা শহরের আবু মুসা জানান, তাদের বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের অভাবে মাঝে মধ্যেই খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। এ ছাড়া তাদের এলাকায় বোরো ধানক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা।

বকশীগঞ্জের বাট্টাজোড় গ্রামের দুলাল হুসাইন বলেন, বোরো-ইরি ধান লাগানো শুরু হয়েছে। ক্ষেতে হাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পানি না থাকায় ধানের চারা লাগানো যাচ্ছে না। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ আড়াই ঘণ্টা থাকে। কিন্তু টানা ২০ মিনিটও থাকে না। তিন-চার ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ এলেও ১৫-২০ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। ফলে বিদ্যুচ্চালিত সেচপাম্প চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে ইলেকট্রিক মোটরের ইঞ্জিন জ্বলে যায়। এ অবস্থা চললে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষকরা।

বকশীগঞ্জ শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মো. মানিক সওদাগর জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩-৪ ঘণ্টা পরপর ১৫-২০ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ আসে। ওই বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানো যায় না। এতে মেশিন বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে কয়েক হাজার ব্যবসায়ীর লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে। বকশীগঞ্জ পল্লী  বিদ্যুতের ডিজিএম মোহাম্মদ আবদুল জলিল বলেন, "বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বেকায়দায় আছি। বিদ্যুৎ না পেয়ে গ্রাহকরা প্রায়ই কার্যালয়ে এসে গালিগালাজ করছেন। দুই সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে না। কতদিনের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে আমি জানি না। "

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার পানা উল্লাহ জানান, আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের একটি ইউনিট মেরামত করা হচ্ছে ও অন্য দুটিতে গ্যাসের চাপ না থাকায় পুরো উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে এমন লোডশেডিং হচ্ছে। কত দিনের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে- তা তিনি জানেন না।

 


মন্তব্য