kalerkantho


বাংলাদেশে জাল নোট ছাপছে আইএসআই : আনন্দবাজারের খবরটি ভিত্তিহীন

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৭



বাংলাদেশে জাল নোট ছাপছে আইএসআই : আনন্দবাজারের খবরটি ভিত্তিহীন

প্রতীকী ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২টি, ঢাকায় একটি ও চট্টগ্রামে ২টিসহ ৫টি অফসেট মেশিনে জাল নোট ছাপছে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই বা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টালিজেন্স। ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এমন সংবাদের সত্যতা জানতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন আইনশৃখলা বাহীনি খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানান।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতীয় জাল রূপী এর আগে ব্যাপকহারে ভারতে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপকহারে পাচার হবার কথা অস্বীকার করেননি।  
শুক্রবার রাতে শিবগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ রমজান আলী ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে অফসেট মেশিনে জাল নোট ছাপছে আইএসআই এমন খবরকে আজগুবি-মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানান। তিনি আরো জানান, গোয়েন্দা নজরদারী জোরদার রয়েছে, এমনটি হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে তিনি বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতীয় জাল রূপী এর আগে ভারতে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপকহারে পাচার হবার কথা অস্বীকার করেননি।  
আইনশৃংখলাবাহীনিসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা ও পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে র‌্যাব-৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের সদস্যরা গত ২৫ নভেম্বর (২০১৬) রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের শাহাপাড়া মুন্সীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাহাপাড়া মুন্সীপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে ও মনাকষা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড সদস্য, ভারতীয় জাল রুপী তৈরী ও পাচারের গডফাদার মোঃ হাবিবুর রহমান(৩৮) ওরয়ে হাবিল শেখকে ৫০ হাজার ভারতীয় জাল রুপিসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত ১ ফেব্র“য়ারী শিবগঞ্জ থানা পুলিশ প্রায় প্রায় ২৩ লক্ষ সমমানের জাল ভারতীয় রূপী আটক করে।
২০১৩ ও ২০১৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হওয়া ভারতীয় জাল রুপী আটকের ঘটনা তেমন বেশী না থাকলেও ২০১৫ থেকে আবার তা শুরু হয়। ২০১১ ও ২০১২ সালে কয়েকটি অভিযানে পুলিশ ও বিজিবি  কোটি টাকার উপর ভারতীয় জাল রুপী আটক করতে সক্ষম হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন সীমান্তে। কিন্তু ভারতীয় জালরুপী পাচারের সাথে জড়িতরা এবং গডফাদাররা থেকে যায় বরাবরই ধরা ছোায়ার বাইরে। বাহকরা আটক হলেও কিছুদিন পরেই জামিনে বের হয়ে এসে জড়িয়ে পড়ে একই কাজে। এসব জালরুপী পাচারের সাথে জড়িতরা হুন্ডি ব্যবসার সাথেও জড়িত। হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে চলে যাওয়া টাকা ও রুপীসহ পাচার হওয়া জাল রুপী ভারতে বিক্রির পাশাপাশি গরু,অস্ত্র,ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা কসমেটিক্স পন্য ও কাপড়,ফেন্সিডিল কেনা ও পাচারের জন্য লেনদেনসহ এলসি  করা পন্য এলসি ভ্যালুর চেয়ে ভারতে দাম বেশী হলে তা পরিশোধের জন্য জালরূপী আদান প্রদান হয়ে থাকে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
আনন্দবাজারের খবর প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, খবরটি ভিত্তীহীন, এ বিষয়ে আমাদের তৎপরতা আছে।

জাল রূপী আটক ও উদ্ধারের কয়েকটি খতিয়ান
শিবগঞ্জ উপজেলার কাশিয়াবাড়ী গ্রামের আয়েশ উদ্দীনের ছেলে সাকিম আলী (৩০) ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর ৬৯ লক্ষ ভারতীয় অবৈধ জাল রুপীসহ আটক হয় শিবগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে।  
গত ২৫ নভেম্বর মনাকষা ইউনিয়নের শাহাপাড়া মুন্সীপাড়া এলাকায় মনাকষা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড সদস্য, ভারতীয় জাল রুপী তৈরী ও পাচারের গডফাদার মোঃ হাবিবুর রহমান(৩৮) ওরফে হাবিল শেখকে ৫০ হাজার ভারতীয় জাল রুপিসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত ১ ফেব্র“য়ারী শিবগঞ্জ থানা পুলিশ প্রায় প্রায় ২৩ লক্ষ সমমানের জাল ভারতীয় রূপী আটক করে।
শিবগঞ্জ উপজেলার দায়পুকুরিয়া ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী গ্রামের আয়েশ উদ্দীনের ছেলে সাকিম আলী (৩০)কে ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর ৬৯ লক্ষ ভারতীয় অবৈধ জাল রুপীসহ আটক হয় শিবগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে।  
২০১২ সালের ৭ নভেম্বর সিংনগর সীমান্তে চাঁদপুর এলাকায় ২ লক্ষ ৯৬ হাজার ও পরের দিন একই এলাকা থেকে ২ লাখ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। ২০১২ সালের ১০ জুন র‌্যাব বিনোদপুর খাসেরহাট বাজার এলাকায় একটি আম বাগানে অভিযান চালিয়ে থেকে ৫০ হাজার ভারতীয় জাল রূপীসহ কবির হোসেন নামে একজনকে, একই সালের ৩১ আগস্ট পুলিশ একবরপুর এলাকা থেকে ৩ লাখ ৯৮ হাজার ভারতীয় জাল রুপিসহ একবরপুর গ্রামের মঞ্জুর আলীর ছেলে আতাউর রহমানকে, ২০১১ সালের ৬ ডিসেম্বর রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা এলাকা থেকে ১২ লাখ জাল ভারতীয় রুপীসহ শিবগঞ্জ উপজেলার একবরপুর গ্রামের তোফাজ্জল হকের ছেলে শরিফুল ইসলামকে, একই সালের ৯ সেপ্টেম্ব নাচোল থানা পুলিশ নাচোল বাজার এলাকা থেকে আবুল কালামের বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে আড়াই হাজার ভারতীয় রুপি ও মাদকসহ আবুল কালামের স্ত্রী কাকলী বেগম (২২) কে গ্রেফতার করে।
২০১০ সালের ২৫ আগস্ট শিবগঞ্জ পৌর এলাকার শেখটোলা গ্রাম থেকে ২২ হাজার জাল টাকা ও ৮০০ ভারতীয় জাল রুপিসহ একজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ২০১২ সালের ১৯ মে গোমস্তাপুর উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রাম থেকে ৭০ হাজার টাকার জাল নোটসহ হাবিবুর রহমান (৪৫) নামে এক ব্যাক্তিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ২০১২ সালের ৩১ আগস্ট বিনোদপুর ইউনিয়নের একবরপুর গ্রাম থেকে ৪ লাখ ভারতীয় জাল রুপি সহ আতাউর রহমান (৫৫) কে আটক করে শিবগঞ্জ থানা পুলিশ। ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর শিবগঞ্জ উপজেলার সিংনগর সীমান্তে ২ লক্ষ ৯৬ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিংনগর সীমান্ত এলাকা থেকে আজ বৃহস্পতিবার ভোরে আরো ২ লাখ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। এই নিয়ে দুদিনে শিংনগর সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। শাহবাজপুর ইউনিয়নের মড়লটোলা গ্রামের একটি পরিত্যাক্ত ঘর থেকে ৬ লক্ষ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। তারাপুর মাঠ এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ৬ লাখ ভারতীয় রুপি উদ্ধার করে বিজিবি। গোপালপুর ঘাট এলাকায় ৮ লক্ষ ভারতীয় জাল রুপী আটক করে বিজিবি। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর আজমতপুর সীমান্তে ১ লাখ ভারতীয় জাল রুপী উদ্ধার করে বিজিবি। ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর  মনাকষায় ১৬ লক্ষ ৯৩ হাজার ভারতীয় জাল রুপীসহ সামসুদ্দিনের ছেলে জুয়েলকে তার বাড়ি থেকে আটক করে বিজিবি।  ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর মনাকষায় ৪ লক্ষ ৪৯ হাজার ভারতীয় জাল রুপীসহ একটি মটরসাইকেল উদ্ধার করেছে বিজিবি।  
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় জাল রুপী পাচারকারী সিন্ডিকেট বিশেষ করে শিবগঞ্জের মনাকষা, মাসুদপুর, মনোহরপুর, জমিনপুর, ঠুঠাপাড়া,তারাপুর,শিংনগর,পারচৌকা,বিনোদপুর ও আজমতপুর সীমান্তে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে জাল রুপী ও দেশী জাল টাকা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝেও লেনদেন করে থাকে ও পৌছে দেয়ার পাশাপাশি ভারতে পাচার করে। বিশেষ করে এপার-ওপারে গরু কেনা বেচার সময় এধরনের জাল টাকা ও রুপী বেশী লেনদেন হয়ে থাকে।  
জুব্বা,পাঞ্জাবী,সার্ট,কানা,সেলাই। এ সাংকেতিক ভাষাগুলি ১ হাজার রুপীর নোট জুব্বা,৫০০ রুপীর নোট পাঞ্জাবী,১০০ রুপীর নোট সার্ট, কথিত নিরাপত্তা সুতাহীন রুপী হলে কানা,সুতা লাগানো হলে সেলাই করা। সাংকেতিক ভাষায় ১ লাখ রুপীকে বলা হয় ১০০ টাকা। এসব ভাষার সংকেত ব্যবহার হয় জাল রুপী ও টাকা ব্যবসার সাথে জড়িতদের মধ্যে। এর আগে ঢাকা থেকে জাল টাকা ও রুপী ও কথিত নিরাপত্তা সুতা চলে আসে শিবগঞ্জে,এরপরে সেলাই (নিরাপত্তা সূতা লাগানো) হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্তে। এরপরে কয়েক হাত বদল হয়ে চলে যায় ভারতে। ১ লাখ রুপীতে (১০০/২০০ পিস/টি ) কথিত নিরাপত্তা সুতা লাগানো জন্য কারীগর পেতেন ৮০০ টাকা। শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় জাল রুপী ও টাকার রমরমা ব্যবসা চললেও গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গোয়েন্তা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায় এর আগে ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২৫০ কোটি ভারতীয় জাল রুপী পাচারের জন্য পাঠায় জালিয়াতচক্র।  
জাল রুপী সংগ্রহ,সরবরাহ,বিক্রয় ও রুপীতে নিরাপত্তা সুতা লাগানোর সাথে জড়িত রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ও সিন্ডিকেট। জানা গেছে ভারতীয় জাল রুপী পাকিস্থান থেকে আসে ঢাকার মূল গডফাদার এক মহিলার কাছে। সেখান থেকে বিভিন্ন পথে বিভিন্নভাবে চলে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জে। ঢাকায় ১ লাখ ভারতীয় জাল রুপী কেনা হয় ৭/৮ হাজার টাকায়। শিবগঞ্জের গডফাদাররা সে টাকা বিক্রি করেন ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। ৩য় হাত তা বিক্রি করে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকায়। জাল রুপী পৌছার পরে জালরুপীতে সুতা সংযোজন করার পরে কয়েক হাত ঘুরে তা চলে যায় সীমান্তের ওপার ভারতে। এর আগে ঢাকায় র‌্যাব ভারতীয় জাল রুপীসহ কয়েকজনকে আটক করায় র‌্যাব বিবৃতি দেয় এবং সেখানে আটককৃতদের একজন জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ দিয়ে তারা আড়াই‘শ কোটি ভারতীয় জাল রুপী কেনাবেচা ও পাচারের জন্য তাদের লোকের মাধ্যমে পাঠায়।


মন্তব্য