kalerkantho


সুন্দরবনে বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র

এবার কুমির ‘বাঁচাতে’ চিতাবিড়াল হত্যা!

৬২ কুমিরছানা উধাও ও মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৪২



এবার কুমির ‘বাঁচাতে’ চিতাবিড়াল হত্যা!

সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের কুমির বাঁচাতে চিতাবিড়াল হত্যার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, মূলত কুমিরের ৪৩টি ছানা উধাও এবং মৃত অবস্থায় ১৯টি ছানা উদ্ধারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে চিতাবিড়াল হত্যা করে বন বিভাগ গোটা ঘটনাটি আড়াল করতে চাইছে। বন বিভাগ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আগের ৪৩টি কুমিরছানাও এই চিতাবিড়াল খেয়ে ফেলেছে। রবিবার রাতে চিতাবিড়াল হত্যার ঘটনা ঘটে। সন্দেহ করা হচ্ছে, ৪৩টি কুমিরছানা চুরির ঘটনা আড়াল করার চষ্টোয় ১৯টি কুমিরছানার মৃত্যু হয়েছে এবং চিতাবিড়ালটিকে হত্যা করা হয়েছে। এ নিয়ে গত আট দিনে ৬২টি কুমিরছানা উধাও ও মারা গেছে।

বন বিভাগ দাবি করেছে, রবিবার রাতে কুমিরের প্যানের (কৃত্রিম পুকুর) ভেতরে কুমিরছানাকে আক্রমণকারী একটি চিতাবিড়ালকে গুলি করে হত্যা করেন প্রহরীরা। প্রাণীভোগী এই চিতাবিড়ালটির আক্রমণে ১৯টি কুমিরছানা মারা গেছে। হত্যার পর চিতাবিড়ালটির দেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনায় পাঠানো হয়েছে বলে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মেহেদী জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবে দুই থেকে আড়াই ফুট দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটি বিড়াল কিভাবে এতগুলো কুমিরছানাকে আক্রমণ করে মেরে ফেলল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর ১৯টি কুমিরছানা মৃত্যুর ঘটনা বলা হচ্ছে শনিবার রাতে।

চিতাবিড়াল হত্যার ঘটনা ঘটেছে এক দিন পর, অর্থাৎ রবিবার রাতে।

এর আগে গত ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি কুমিরছানা পালনের প্যান থেকে দুই দফায় ৪৩টি কুমিরছানা উধাও হয়ে যায়। এই কুমিরছানাগুলো চুরি করে পাচার করা হয়েছে বলে শোরগোল ওঠে। এরপর গত রবিবার সকালে কুমিরের ১৯টি মৃত ছানা পাওয়া গেল। এরপর রবিবার রাতে চিতাবিড়ালের আক্রমণের ঘটনা ঘটল এবং চিতাবিড়ালটিকে হত্যা করা হলো। ২০০২ সালে এই বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এখানেই কুমিরের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করা হয়। এত দিনে এখানে কোনো চিতাবিড়ালের আক্রমণের ঘটনা শোনা যায়নি।

বন বিভাগের দাবি, প্রথম দুই দফায় ৪৩টি কুমিরছানা চুরি কিংবা পাচার হলেও তৃতীয় দফায় ১৯টি কুমিরছানা হিংস্র চিতাবিড়ালের আক্রমণেই মারা গেছে। এর আগে ৪৩টি কুমিরছানা নিখোঁজ প্রসঙ্গে একেকজন একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। একবার বলেছেন চুরি হয়েছে, একবার বলেছেন কুমিরছানা দেখাশোনা করার দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি জাকির ও মাহাবুব সেগুলোকে হত্যা করেছেন। কারণ হিসেবে দাবি করা হয়, এই কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে ওই দুই কর্মচারীর সম্পর্ক ভালো না থাকায় তাঁরা কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে এ কাজ করেছেন। এরপর এলো চিতাবিড়ালের আক্রমণ ও হত্যার ঘটনা।

কুমিরছানা নিখোঁজ ও মারা যাওয়ার ঘটনায় বন বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান হচ্ছেন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মেহেদী জামান।

কুমির প্রজনন কেন্দ্রে বন বিভাগের পক্ষ থেকে নজরদারি আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। কুমিরছানা সংরক্ষণের জন্য ছোট ছোট কৃত্রিম পুকুরগুলোর ভেতরের চারপাশে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ছাড়া লোহার নেট দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পুকুরের বাইরের অংশ। ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দুটি প্যান থেকে ৪৩টি কুমিরছানা উধাও হয় এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯টি কুমিরছানা রহস্যজনকভাবে মারা পড়ে।

আমাদের বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, ৪৩টি কুমিরছানা উধাও হওয়ার ঘটনায় আগের বক্তব্য থেকে সরে এসেছে বন বিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম গতকাল জানিয়েছেন, রবিবার সকালে ১৯টি মৃত কুমিরছানা উদ্ধার করা হয়। এগুলো শনিবার রাতে মারা যায়। পরে সিসিটিভির ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, রবিবার গভীর রাতে একটি চিতাবিড়াল ওই প্যানের মধ্যে ঢুকে কুমিরছানা শিকারের চষ্টো করছে। এ সময় বন প্রহরীরা গুলি করে ওই চিতাবিড়ালটি হত্যা করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, চিতাবিড়ালটি লোহার নেট দিয়ে ঘেরা প্যানগুলোর ওপরে থাকা ত্রিপল ছিঁড়ে নেট গলিয়ে ভেতরে ঢোকে।

ডিএফও মো. সাইদুল ইসলাম আরো জানান, মৃত চিতাবিড়ালটিকে ময়নাতদন্তের জন্য মোংলা প্রাণিসম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ওই চিতাবিড়ালটির পেটে কুমিরের বাচ্চার কয়েক টুকরো হাড় পাওয়া গেছে।

এর আগে ৪৩টি কুমিরছানা গায়েবের ঘটনায় ডিএফও সাইদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমানকে ফাঁসাতে ওই কেন্দ্রের লস্কর মাহাবুব আলম পরিকল্পিতভাবে প্যান থেকে ৪৩টি কুমিরছানা চুরি করেন বলে গঠিত কমিটি প্রাথমিকভাবে এমন তথ্য প্রমাণ পেয়েছে। কুমিরছানা চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই প্রজনন কেন্দ্রের লস্কর মাহাবুব আলমকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই কেন্দ্রের দিনমজুর জাকির হোসেনের বিরুদ্ধ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান জানান, কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি লোহার জাল দিয়ে ঘেরা এবং তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ওই কেন্দ্রের প্যানগুলোতে (চৌবাচ্চা) ছোট-বড় মিলে ২৭৭টি কুমির ছিল। গত ২৯ এবং ৩০ জানুয়ারি দুই দিনে ওই কেন্দ্র থেকে ৪৩টি কুমিরছানা চুরি হয়ে গেছে। এরপর রবিবার সকালে মৃত অবস্থায় ১৯টি ছানা পাওয়া গেছে।


মন্তব্য