kalerkantho


সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর বিষয়ে গণশুনানি

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১১:৩১



সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর বিষয়ে গণশুনানি

সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পার্শ্ববর্তী ঝাউচর এলাকার শাহনাজ বেগম নামে একজন গৃহবধূ বলেন, স্বর্ণালংকারের রং পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণকাররা বিশ্বাস করছেন না গহনাটি স্বর্ণের।

পরে ঘষা দিয়ে বুঝতে পারছেন গহনাটি আসলেই স্বর্ণের। একই এলাকার আসমা আক্তার খাতুন নামে অপর একজন নারী বলেন, আমি যখন চামড়া শিল্পনগরীর কাছ দিয়ে সিএনজিতে করে আসি তখন নাকে রুমাল ব্যবহার করেও উৎকট গন্ধ থেকে রেহাই পাই না। পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। মাছ মরে ভেসে উঠছে। শ্বাসকষ্ট হয়। শিশু ও বৃদ্ধদের সমস্যাটা আরো বেশি হয়। ' সাভারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বাস্তবায়নাধীন 'চামড়া শিল্পনগরী ঢাকা' প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হতে না হতেই সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীকে কিভাবে দূষিত করছে এবং আশেপাশের অধিবাসীরা এই দূষিত পরিবেশের কতটা শিকার হচ্ছেন তা উল্লেখ করতেই এক গণশুনানিতে এ সকল সমস্যার চিত্র তুল ধরেন ওই দুই নারী।

সাভার ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যে যেন ধলেশ্বরী নদী এবং সংযুক্ত বংশী নদী ও কর্ণতলী খাল দূষিত হতে না পারে এবং সাভারের পরিবেশ যেন রাজধানীর হাজারীবাগের মতো বিপন্ন না হয় এসব বিষয়ে আশু করণীয় নির্ধারণে কমিউনিটি লিগ্যাল সার্ভিসেস (সিএলএস) এর সহযোগিতায় সাভার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শুক্রবার সকালে এ গণশুনানির আয়োজন করে যৌথভাবে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্রান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিল্স), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থা, নিজেরা করি, ও সাভার পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ।  

গণশুনানিতে প্রধান অতিথি হিসেব উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা.মো.এনামুর রহমান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাভার উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার সভাপতিত্বে গণশুনানিতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হক। তিনি বলেন, ২৮০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে সাভার উপজেলা বংশী, ধলেশ্বরী আর তুরাগ নদী দ্বারা বেষ্টিত। এক সময় খাদ্যে উদবৃত্ত সাভার বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি এলাকার তালিকায়। সাভারের সর্বত্রই এখন অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আর নগরায়নে সয়লাব হয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ আরো শক্তিশালী। অপরিকল্পিকতভাবে শিল্পায়ন, নগরায়ন আর তথাকথিত আধুনিকায়নের বদৌলতে সমগ্র সাভার এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল নদী-নালা, খাল-বিলের পানি যেমন দূষিত হয়েছে, তেমনই নদী-খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি দূষণ আর নদী দখলের পালা অব্যাহত আছে।  

সরকারী উদ্যোগে এলাকার মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ডিইপিজেড ও সাভার চামড়া শিল্পনগরী তৈরি করা হয়েছে। আর সেই শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এলাকার মানুষের অবশিষ্ট হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি গত বিশ বছর যাবত ফসলহীন এবং আগামী ২০-২৫ বছর এই জমিতে ফসল না হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইপিজেডের বর্জ্য ধলাই বিল হয়ে বংশী নদীতে মিশে নয়ারহাটের উজান থেকে সাভারের ভাটিতে কর্ণতলী খাল পর্যন্ত নদীর পানি দূষিত হয়ে গেছে। রাসায়নিক বর্জ্যের তীব্রতার কারণে বর্ষাকালেও এই নদীর পানি স্বাভাবিক হয়না। ইপিজেড ছাড়াও ব্যক্তিমালিকানায় বহু শিল্পকারখারনার রাসায়নিক বর্জ্য স্থানীয় খাল ও নিচু জমি দিয়ে বংশী ও তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে খাল ও নিচু এলাকায় শুধু ফসলেরই ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, কোনো কোনো এলাকার মানুষ তার আবাসস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে অথবা সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।  

সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধন না করে ধলেশ্বরী নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করছেন। নানা কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পদার্থ সম্বলিত এই পানি তীরবর্তী এলাকার টিউবয়েল ও কুপের পানির স্তরের সাথে সংযোজিত হচ্ছে। আশেপাশের পুকুরের স্তরের সাথে সংযোজন হয়ে পুকুরের পানি দূষিত হচ্ছে। এই অবস্থা অব্যাহত আছে। পানি দূষিত হওয়ার কারণে দূর্গন্ধসহ নানা রকমের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কৃষিসহ সকল কাজে গ্রাউন্ড ওয়াটার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। যার পরিনতি ভয়াবহ। এই এলাকায় নদী ও খাল-বিলে প্রাকৃতিক মাছ একবারেই নেই। মাছের আবাদও বন্ধ হয়ে গেছে।  

গণশুনানি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, তিনি পরিবেশের উন্নয়নে প্রয়োজনে সংসদে বিষয়টি তুলবেন। ২০০৩ সালে তৎকালীন সরকার দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে হাজারীবাগ থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে সাভারে এ ট্যানারি শিল্প স্থাপনের জন্য দোষারোপ করেন। তিনি বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসেসিয়েশন কর্তৃক নিয়োজিত কনসালট্যান্টকে দুষণের কারণ এবং ক্ষতির বিষয়ের উপর একটি রিপোর্ট দিতে বলেন। এছাড়া তিনি বলিয়ারপুরে স্থাপিত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ডাম্পিং স্টেশনের পরিবেশ উন্নয়নে গৃহীত কর্মকান্ডের বিষয় তুলে ধরেন। এনামুর রহমান ডিইপিজেড কর্তৃক পরিবেশ দূষণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তিনি নিজে নৌকা নিয়ে দূষিত এলাকাসমূহ ঘুরে দেখেছেন। পরে ডিইপিজেডের জিএমকে বিষয়টি জানিয়েছেন।  

এ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মিসেস রোকেয়া হক, সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মোল্লা, নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, আজম খান বাবু প্রমূখ।


মন্তব্য