kalerkantho


সিআরপি আয়োজিত আলোচনা সভা

ইজিবাইকে ওড়না পেচিয়ে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা

সাভার প্রতিবেদক   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ১৯:৫০



ইজিবাইকে ওড়না পেচিয়ে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা

গলায় পেচানো নিজের ওড়নাটি ইজিবাইকটির মোটরে পেচিয়ে স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ার পাশাপাশি মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষা থেকেও ছিটকে পড়েছে শাপলা। প্রাণে বেঁচে গেলেও তার বাকি জীবনের সকল হাসি-আনন্দ কেড়ে নিয়ে গেছে ব্যাটারিচালিত ওই ইজিবাইকটি।

স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়া ওই শিক্ষার্থীর নাম সামিরা আক্তার শাপলা। রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পদ্মপুকুর গ্রামের শওকত আলী ও নাসিমা বেগম দম্পতির সন্তান শাপলা। রংপুর কারমাইকেল কলেজে সে অর্থনীতিতে মাস্টার্সে পড়ালেখা করছিলেন ।  

সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) চিকিৎসা নিতে আসা শাপলা বলেন, মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। চলতি বছরের ২৮ মে তারিখে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যাটারিচালিত একটি ইজিবাইকে চড়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে তার গলায় পেচানো ওড়নাটি হঠাৎ ইজিবাইকের মোটরে পেচিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তিনি নিজেকে আবিস্কার করেন রংপুর সদর হাসপাতালে। তিন দিন সেখানে চিকিৎসা নিয়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে।  

সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসা নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) ভর্তি হন গত ১০ জুলাই। এখনো চলছে তার চিকিৎসা।

সিআরপির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা: ইসরাত জাহান উর্মি কালের কণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি ইজিবাইকের মোটর অথবা চাকায় ওড়না পেচিয়ে মেরুরজ্জুতে ক্ষত নিয়ে অনেক রোগী সিআরপিতে ভর্তি হচ্ছে। গত এক বছরে অন্তত ৩৮ জন রোগী একই সমস্যা নিয়ে সিআরপিতে ভর্তি হয়েছে। এছাড়া অনেকে মারাও যাচ্ছেন।  

তিনি আরো বলেন, ওড়না পেচিয়ে সাধারণত মেয়েদের গলার কয়েকটি হাড়ে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এই চাপে হাড়গুলো স্থানান্তর হয়ে যায়। আর এর ফলে মরুরজ্জুর মারাত্মক ক্ষতি হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাত-পা অবশ হয়ে যায়, বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে। পায়খানা-প্রশ্রাবেও সমস্যা তৈরি হয়। ‘ট্রমাটিক টেট্রাপ্লেজিয়া’ নামের এই রোগে আক্রান্ত যে কেউ যে কোন সময় মারা যেতে পারে। একজন রোগীর সুস্থ হয়ে উঠতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগে। রোগীর মাংসপেশিতে শক্তি থাকলে কিছুটা ভালো হয়ে ওঠে। এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সিআরপিতে এখন পাঁচজন রোগী চিকিৎসা নিছে। সকলের সমস্যা প্রায় একই রকম।

শাপলা আবার কলেজের নিজ ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে চান। তিনি আশা করছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে তিনি ফের কলেজে যেতে পারবেন। তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার সিআরপি আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে। ‘দুর্ঘটনা পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপঃ চিকিৎসা সেবা, অনুসন্ধান ও ন্যায় বিচার’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সিআরপি দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

শাপলার মতো একই রকম দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সিআরপিতে চিকিৎসাধীন আছে ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকর থানার হাড়িয়া গ্রাসের রবিউল ইসলাম ও জুলেখা বেগম দম্পতির ১০ বছরের মেয়ে রুমি আক্তার। সে নিজ গ্রামে ব্র্যাক স্কুলে চতুর্থ শেণিতে পড়ালেখা করত।  

চলতি বছরের ১ বৈশাখ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে হরিপুর থানায় বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার দেখে ফেরার সময় রুমির গলায় পেচানো ওড়নাটি ব্যাটারিচালিত একটি ইজিবাইকের মোটরে পেচিয়ে গলার মেরুরজ্জুতে আঘাত পায় সে। এর ফলে গলার নিচ থেকে তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেছে। রুমির বাবা দিনমজুর। মেয়ের চিকিসা ঠিকমতো করতে পারছেন না। রুমি সিআরপিতে ভর্তি হয়েছে গত ২০ এপ্রিল। তাকে একজন মাউথ পেইন্টার হিসেবে মুখের সাহায্যে চিত্রাঙ্কন শিখানো হচ্ছে সিআরপিতে। সে এখন মুখ দিয়ে কিছু কিছু আঁকা-আঁকি শিখেছে।

আজ শনিবার সকাল সোয়া আটটায় সিআরপির বাস্কেটবল মাঠে দিনটির উদ্বোধনের পর একটি র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র‌্যালিটি সিআরপি থেকে শুরু হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শিমুলতলায় গিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। পরে সিআরপির রেডওয়ে হলে দিনটি উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় আলোচনা অনুষ্ঠান।  

আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিআরটিএ)- এর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওভার টেকিং, মাত্রাতিরিক্ত গতিসীমা, অতিরিক্ত মালামাল বহন, ট্রাফিক নিয়মের অবমাননা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক, মাদকাসক্ত অবস্থায় যান চালনা, যান চালনার সময় মোবাইলে কথা বলা এগুলোও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো হলো- গণমাধ্যমের সহায়তায় ট্রাফিক আইন স¤পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা, যান চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, কঠোর আইন প্রনয়নের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন পরিচালনা নিষিদ্ধ করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩ লক্ষ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ১০ লক্ষ স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন যেমন- নসিমন, করিমন, ইজিবাইক এই বিপুল সংখ্যক সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ শতাংশই পথচারী এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের ৫২ শতাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সারা দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশই গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় না।

সিআরপি’র পরিসংখানে দেখা যায়, সিআরপি’তে চিকিৎসা নিতে আসা মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের শতকরা ২০ ভাগ রোগীই সড়ক দুর্ঘটনার কারণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে।

আলোচনা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বায়ক ড. ভেলরি টেইলর। এ সময় সিআরপির নির্বাহী পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম, সিআরপির ভলান্টিয়ার, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্র-শিক্ষক, রোগী, সরকারি-বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য