kalerkantho


বিনা চিকিৎসায় শ্রমিক তাসলিমার মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ১৯:২৪



বিনা চিকিৎসায় শ্রমিক তাসলিমার মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ

ঢাকার উপকন্ঠ আশুলিয়ায় উইন্ডি কারখানার ভেতর নারী শ্রমিক তাসলিমা কেনো মারা গেলো মালিকপক্ষের কাছে তার জবাব, দোষীদের শাস্তি এবং যথাযথ ক্ষতিপুরণ প্রদানের দাবিতে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির আশুলিয়া শাখার উদ্যোগে শুক্রবার বিকেল ৪টায় শিল্পাঞ্চলের জামগড়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

সংগঠনটির আশুলিয়া শাখার আহবায়ক আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সভাপতি তাসলিমা আখতার লিমা, কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ  সম্পাদক প্রদীপ রায়, কেন্দ্রীয় নেতা জিয়াদুল ইসলাম, বাবুল হোসেন , বিল্লাল হোসেনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

নেতৃবৃন্দ বলেন, নাটোর থেকে আসা শ্রমিক তাসলিমা আক্তার (২৪) গত ১ বছর ধরে উইন্ডি অ্যাপারেলসে সুইং অপারেটর হিসাবে কাজ করছিলেন। ৫ বছর আগে তিনি মানিকগঞ্জের সুলতানকে বিয়ে করেন। সুমাইয়া নামে তাদের ৩ বছরের একটি মেয়ে আছে। ঘটনার দিন ১৩ অক্টোবর কারখানায় প্রবেশ মুখেই সে অজ্ঞান হয়। কারখানায় চিকিৎসক দেখিয়ে ছুটি না দিয়ে পুনরায় তাকে কাজে বসায় কর্তৃপক্ষ। শরীরের অবস্থা অবনতি হলেও ছুটি না দিয়ে তাকে কাজ করতে বাধ্য করে তারা।

দুপুরে লাঞ্চের সময় কারখানায় আবারও অজ্ঞান হয়ে সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।

পরবর্তীতে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলে দুপুর দেড়টার দিকে কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বক্তারা দাবি করেন, অসুস্থ অবস্থায় তাসলিমার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না করে উল্টো কাজে বাধ্য করায় তাসলিমার মৃত্যু ঘটেছে। যথাসময়ে সুচিকিৎসা এবং বিশ্রামের সুযোগ পেলে তাঁকে বাঁচানো যেত।

তাঁরা বলেন, কর্তৃপক্ষের এই অবহেলা- অমনোযোগ প্রমাণ করে শ্রমিকের জীবনের কোন মূল্য তাদের কাছে নেই। ফলে এই মৃত্যুকে কেবল অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা বলা যায় না বরং এটি অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড-যার দায় মালিক, সরকার এবং বায়ারের উপর বর্তায়। এই ঘটনায় মালিকসহ দোষী কর্তৃপক্ষের শাস্তি হওয়া জরুরি।   দোষীদের শাস্তি না হলে এ ধরনের ঘটনার পূণরাবৃত্তি বন্ধ করা সম্ভব নয়। অথচ এখনো দোষীরা আইনের আওতার বাইরে আছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, মালিকপক্ষ তাসলিমার বেতন, ছুটির টাকা, ইন্সুরেন্সের টাকা সহ প্রায় ৪ লাখ টাকা তাসলিমার স্বামী সুলতান ও তার মেয়েকে দিয়েছে। কিন্তু এটা ক্ষতিপূরণ না। তাসলিমা বেঁচে থাকলে যে পরিমাণ আয় করতো তার সাথে অন্যান্য সুবিধা পাওনা এবং মূদ্রাস্ফীতি হিসাব করে একজীবনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ক্ষতিপূরণের আইনে কারখানায় শ্রমিক মারা গেলে ১ লাখ টাকা আইন আছে যেটা কখনোই হতে পারে না। রানা প্লাজা ধসের পর বিশেষজ্ঞরা হাইকোর্টে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করার জন্য সুপারিশ করেন। অথচ এখনো আইন বদল হয়নি। শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের আইন বদল এবং শ্রমিকের একজীবনের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি করেন তারা।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন,  কারখানার অভ্যন্তরে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সকল কারখানা নজরদারি করতে এবং শ্রমিকের নিরাপত্তা বিধানে শ্রমপরিদর্শককে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাজ দূর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালী করতে হবে, পরিদর্শকের সংখ্য বাড়াতে হবে, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারের সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শামা গতকাল ২০ অক্টোবর তাসলিমার বড় বোন নাসরিনের জামগড়ার বাসায় তাসলিমার মা খুরশীদার সাথে দেখা করতে গেলে তাসলিমার মা খুরশীদা বেগম জানান, তিনি সৌদীআরবে শ্রমিক হিসাবে কাজ করছিলেন গত ৮ মাস ধরে। এর আগে তিনি আবুধাবিতে কাজ করেন। ৯ বছর আগে তাসলিমার বাবা মারা যাবার পর পরিবারে দুর্যোগ নেমে আসে। পরিবারের হাল ধরতে তিনি (তাসলিমার মা) বিদেশে যান শ্রমিক হিসেবে। তাসলিমারা ৩ বোন গার্মেন্টে কাজ নেয়। কিন্তু তাঁদের জীবনে এইরকম পরিণতি হবে তিনি তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। তিনি মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ছুটে আসেন ২০ অক্টোবর। মেয়ের ছোট একটি ছবি ছাড়া কোন স্মৃতি তার কাছে নেই। তিনি মেয়ে হত্যার সাথে জরিত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন।

তাসলিমার মা খুরশীদা বলেন, “আমি আর কিছুই চাই না। যাদের কারণে আমার মেয়ে মারা গেল তাদের বিচার চাই, যারা আমার মেয়েকে বাসায় যেতে দেয় নাই, চিকিৎসা দেয় নাই আমি তাদের বিচার চাই। আমি তো আর আমার মেয়েকে ফেরত পাবো না। মেয়ে হারানোর যন্ত্রণাও কোন কিছুতেই ভুলতে পারবো না। আর কোন মায়ের বুক যেন আমার মতো খালি না হয় তার জন্য আমি বিচার চাই। ”


মন্তব্য