kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাজ করতে বাধ্য করায় অসুস্থ গার্মেন্টস কর্মীর মৃত্যু; বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

১৩ অক্টোবর, ২০১৬ ১৯:০৬



কাজ করতে বাধ্য করায় অসুস্থ গার্মেন্টস কর্মীর মৃত্যু; বিক্ষোভ

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় একটি তৈরি পোশাক কারখানার এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। পরে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ছয়তলা এলাকায় উইন্ডি অ্যাপারেলস কারখানায় এঘটনা ঘটে। নিহত ওই নারী শ্রমিকের নাম তাসলিমা বেগম (২৩)। নিহত ওই নারী শ্রমিক স্বামী সুলতান মিয়া ও সন্তান সুমাইয়াকে নিয়ে স্থানীয় বেরন তেঁতুলতলা এলাকার মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে একটি কক্ষ নিয়ে ভাড়ায় বসবাস করতেন।

শ্রমিকরা জানায়, সকালে উইন্ডি অ্যাপারেলস কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক প্রবেশ করে কাজে যোগ দেয়। এসময় কারখানার ছয়তলার ফ্লোরে অপারেটর তাসলিমা জ্বর ও মাথা ব্যথা অনূভব হলে তিনি লাইনচিফ আলম মিয়ার কাছে গিয়ে ছুটি চান। কিন্তু ওই লাইন চিফ তাকে ছুটি না দিয়ে কাজ করতে বলেন। পরে ওই নারী শ্রমিক দুপুরে কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ফ্লোরে পড়ে যান। এসময় কারখানা কর্তৃপক্ষ ওই নারী শ্রমিককে মুমুর্ষূ অবস্থায় উদ্ধার করে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

এদিকে তাসলিমাকে ছুটি না দেওয়ায় তিনি সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেননি উল্লেখ করে তাসলিমার মৃত্যুর জন্য লাইনচিফ আলম মিয়াকে দায়ী করে তার বিচারের দাবিতে কারখানার ভিতরে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঘটনার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার দুরের পর বাকি সময়ের জন্য কর্তৃপক্ষ কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করলে পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়।

এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের সাথে কোন প্রকার কথা বলতে রাজি হয়নি।

শিল্প পুলিশ-১ সাভার-আশুলিয়া জোনের পরিচালক পুলিশ সুপার (এসপি) মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই নারী শ্রমিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তার বাবার বাড়ি নাটোর এবং স্বামীর বাড়ি ময়মনসিংহ। তিনি আরো বলেন, কর্মস্থলে এ ধরনের মৃত্যুর প্রেক্ষিতে ওই শ্রমিকের প্রাপ্য যাবতীয় সুবিধাদি প্রদানের ব্যাপারে তিনি কারখানার মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানান। এছাড়া কারখানাটিতে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, কারখানার ভেতরে গার্মেন্ট শ্রমিক তাসলিমার মৃত্যুতে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে অবিলম্বে দোষী মালিক ও কর্মকর্তাদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সভাপ্রধান শ্রমিক নেতা তাসলিমা আখতার লিমা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু শ্যামা এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক দীপক রায় এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন।

যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, নারী শ্রমিক তাসলিমা সকাল থেকেই অসুস্থ হওয়ার পরেও কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা না করে উল্টো তাকে কাজ করতে বলে এবং কারখানার ভেতরে আটকে রাখে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, “অসুস্থ তাসলিমার সুষ্ঠু চিকিৎসার উদ্যোগ না নিয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাসলিমার সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা যায় ফ্যাক্টরি লাইন চিফের কাছে তাসলিমা বার বার ছুটি চাইলেও তাকে তারা ছুটি দেয় নি। ফলে তাসলিমার মৃত্যুর জন্য কারখানার কর্তৃপক্ষ ও মালিকই দায়ী। কাজেই অবিলম্বে ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দায়ী কর্মকর্তা ও দায়ী মালিককে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ”

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, তাসলিমার মৃত্যুতে তার পরিবার ও পরিজন যে ক্ষতির শিকার হলো অবশ্যই দ্রুততার সাথে তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। যদিও প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয়না।

নেতৃবৃন্দ বলেন, কারখানার অভ্যন্তরে নিরাপদ কর্মপরিবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সকল কারখানা নজরদারি করতে এবং শ্রমিকের নিরাপত্তা বিধানে শ্রমপরিদর্শককে আরো সক্রিয় ভ’মিকা পালন করতে হবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি- এক্ষেত্রে পরিদর্শকের সংখ্যা, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারের সঠিক নীতিমালা চাই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, গার্মেন্ট শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতির বড় অংশই টিকিয়ে রেখেছে- চিকিৎসা গাফিলতিতে তাদের একজনের মৃত্যুও মেনে নেয়া যায় না; কাজেই অবিলম্বে কারখানার ভেতরে ও বাহিরে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করুন এবং দোষীদের বিচার করে সকল অবহেলা-গাফিলতির সংস্কৃতির অবসান ঘটান।


মন্তব্য