kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাবিতে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ র বিপক্ষে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ!

রোকন রাকিব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৯:০৬



রাবিতে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ র বিপক্ষে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ!

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম ডিজিটাল ক্যাম্পাস প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ ব্যবস্থা উদ্বোধনের একদিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার স্থগিত করা হয়েছে। খোদ সরকারিপন্থি হিসেবে পরিচিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বাধার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ প্রত্যাহারের জন্য গত মঙ্গলবার পৃথকভাবে উপাচার্যের কাছে দাবি করে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ এবং শিক্ষক সমিতি। আগামীকাল শনিবার এ ব্যবস্থাটি উদ্বোধন করা হলে কর্মবিরতি পালনের ঘোষণাও সেসময় দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এ ব্যবস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের স্বাধীনতায় স্বচ্ছতা আনবে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এ ব্যবস্থাটি চালু হলে শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসনে বিবেকের ওপর যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে সেটি খর্ব হবে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগেরই কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আছে। প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আন্দোলনের পেছনে অনিয়ম করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে যায় এমন শিক্ষকদেরও একধরনের চাপ রয়েছে বলে সংগঠনটির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বায়ত্তশাসনের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার বিষয়টি আছে। দায়িত্বে স্বচ্ছতা রাখতে ডিজিটাল উপস্থিতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। হয়ত একটু ভুল বোঝাবুঝি আছে। তাই আপাতত স্থগিত করা হয়েছে, বাতিল তো নাÑএক সময় এসে এটা সময়ের দাবিই হয়ে যাবে। তখন সবাই চাইবে। তাছাড়া আমার অধিকার দায়বদ্ধতার বাইরে নয় এবং দায়বদ্ধতা স্বচ্ছতার বাহিরে নয়। ’

তিনি আরো দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ডিজিটাল ক্যাম্পাস চালুর লক্ষ্যে বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে, তাঁর একটা অংশ অ্যাটেনডেন্স। ইতিমধ্যে অনলাইন ভর্তি, অটোমেশন পদ্ধতিতে ফি পরিশোধ, ওয়াইফাই ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হয়েছে। অটোমেশন পদ্ধতিতে হল পরিচালনাসহ বেশ কিছু কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের আমলে স্মার্ট আইডি কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছর উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অধীনে ৩৫০ কার্ড বিতরণ করা হয়। ২০১২ সালে তৎকালীন কম্পিউটার সেন্টারের হেকেপ প্রকল্পে স্মার্ট কার্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেসময় প্রকল্পের সাব-প্রোজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন অধ্যাপক রকীব আহমেদ, যিনি বর্তমানে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বেই দলের পক্ষ থেকে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হয়।

যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক রকীব আহমেদ কর্মবিরতি কর্মসূচির সিদ্ধান্তগ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল অ্যাটেন্ডেসের বিষয়টি প্রত্যাখান করেছি। শিক্ষক সমিতির সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নেব। ’ স্মার্ট আইডি কার্ড প্রকল্পে দায়িত্বে থাকার বিষয়ে দাবি করেন, ‘আমার পরিকল্পনায় শিক্ষকদের অ্যাটেন্ডেন্সের বিষয় ছিল না। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সামগ্রিক অটোমেশন প্রক্রিয়ার চিন্তা আমার ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই সামগ্রিক ধারণার মধ্যে কাজ করছে না। নিরাপত্তার জন্য তো কোন হল বা অ্যাকাডেমিক ভবনে তো শিক্ষার্থীদের প্রবেশ-প্রস্থানে কোনো মেশিন বসানো হয়নি। ’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র বলছে, স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আগামীকাল শনিবার উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ব্যবস্থার জন্য ইতিমধ্যে প্রতিটি বিভাগ ও দপ্তরে ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্ট মনিটরিং ডিভাইস বসানো হয়েছে। প্রতিদিন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ডিভাইসে নিজেদের স্মার্ট কার্ড টাচ করে উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬৭ তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তক্রমে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহাম্মদ এন্তাজুল হক স্বাক্ষরিত নির্দেশনা গত ৮ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়। তবে সরকারপন্থি শিক্ষকদের একাংশের চাপের মুখে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানান রেজিস্ট্রার।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ বিষয়ে গত রবিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের রবীন্দ্র কলাভবনের ২৪৫ নম্বর কক্ষে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের জরুরি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দলীয় ৬৭২জন শিক্ষকের মধ্যে ৮০-৯০ জন অংশ নেন। সভায় দলের কয়েকজন নেতা ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ নিয়ে জোরালো আপত্তি তোলেন। অংশ নেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন ওই নেতাদের অনুসারী বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ টেনে সভায় অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র বলেন, ‘এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি শিক্ষকদের অবমাননাকর প্রয়াস বলে আমার মনে হয়েছে। ’ অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘আমরা বিশ্বায়নের কথা বলছি, ডিজিটাইজেশনের কথা বলছিÑসেই মাত্রায় যে হাজিরা কার্ড দেওয়া হয়, এটি একটি নিম্নমাত্রার ডিজিটাইজেশন। যেটা বিশ্বায়নের মধ্যে পড়ে না। ’ সভায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনন্দ কুমার সাহা রেজিস্ট্রারের নির্দেশনা প্রত্যাহার না হলে কর্মবিরতির প্রস্তাব দেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ‘ডিজিটাইজেশন উপস্থিতি’ ব্যবস্থা প্রত্যাহার না হলে ১ অক্টোবর কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া আন্দোলন করতে শিক্ষক সমিতিকে চাপ দেওয়ার আলোচনাও হয়।

গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হয়। ’ সেখানে বলা হয়, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ পরিপন্থি রেজিস্ট্রার মহোদয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করছে এবং শিক্ষকদের অ্যাটেনডেন্স চালু করার এহেন উদ্যোগের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ’

এদিকে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের বৈঠকের পরদিন সোমবার রাতে একই ইস্যুতে সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সংগঠনের ১২০০ সদস্যের মধ্যে সভায় প্রায় ১৫০জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১০০ জনই প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ দলীয় বলে জানা গেছে। আগের দিনের শিক্ষক সমাজে আপত্তি তোলা নেতারা সমিতির বৈঠকেও আন্দোলনের জন্য প্রস্তাব করে। সভায় তাঁদের অনুসারী অন্তত ৬৫জন শিক্ষক উপস্থিত ছিল। সরকারপন্থি শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রস্তাবে একপর্যায়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকরাও আন্দোলনে সায় দেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মঙ্গলবার উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ্ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ্ আজম।

ওই দিন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ্ আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী শিক্ষকদের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাদানের কোনো সময়সীমা নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখোনও মধ্য রাতেও শিক্ষকরা যুক্ত থাকবেন গবেষণার সঙ্গে; সৃজনশীল কাজের সঙ্গে, নতুন জ্ঞান সৃজন করবেন এবং বিতরণ করবেন। সেই সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে শিক্ষকদের ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্সের মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত সেই সংস্কৃতির ও শিক্ষকদের মর্যাদার প্রতি আঘাত। ’ রেজিস্ট্রারের নির্দেশনা প্রত্যাহার না হলে শনিবার সকাল ১১টা থেকে ১২টা এক ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করা হবে বলে সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন।

সামগ্রিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘যেকোনো প্রযুক্তি প্রথমে চালু হলে সবাই এটা নিয়ে সন্দেহ পোষণ ও শঙ্কায় থাকেন। বিষয়টি বুঝতে পারলে ধীরে ধীরে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায়। সরকার দেশের সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবার মান, দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেবার মান বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ডিজিটাল ডিভাইসে উপস্থিতি নেওয়ার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।


মন্তব্য