kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খাদ্য অধিকার নিশ্চিতে তৈরি হচ্ছে আইন

প্রান্তিক মানুষের জন্য খাদ্য প্রাপ্তি, পুষ্টি ও সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২০:০৬



প্রান্তিক মানুষের জন্য খাদ্য প্রাপ্তি, পুষ্টি ও সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি

দেশের গরীব ও প্রান্তিক মানুষের কথা মাথায় নিয়ে ‘খাদ্য অধিকার আইন ২০১৬’ খসড়া তৈরি করেছে আইন কমিশন বাংলাদেশ। ওই আইনে খাদ্য অধিকার নিশ্চিতে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

বলেছেন, আইনি কাঠামোর মাধ্যমে খাদ্য প্রাপ্তি, পুষ্টি ও সঠিক সরবরাহ নিশ্চিতকরণে সরকারকে আইনি বাধ্যবাধকতায় নিয়ে আসতে হবে।
 
কার্যকরী ‘খাদ্য অধিকার আইন ২০১৬’ প্রণয়নের লক্ষ্যে আজ বুধবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে একটি পরামর্শক সভার আয়োজন করে আইন কমিশন বাংলাদেশ, খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক, সংসপ্তক ও একশনএইড বাংলাদেশ। ওই সভায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খাদ্য অধিকার নিশ্চিতে একটি কার্যকরি আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
 
অনুষ্ঠানে আসা বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে খাদ্যকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে রাখা হলেও তা আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়। খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশে কোনো আইনি কাঠামো না থাকায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের কোন জায়গায় আবেদন-নিবেদন বা দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। তাই খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন খুবই জরুরি।
 
বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আলোচনায় যুক্ত হন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার শারীরিক প্রতিবন্ধী খালেদা বেগম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশিরভাগ এলাকার পানি। আমার খাদ্য উৎপাদন করতে পারছি না। আমরা অতি নিম্ন আয়ের মানুষ। আবার যা খাচ্ছি তা অতি নিম্নমানের। তাই আমাদের শিশুরা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। তবে এর কোন সমাধান পাচ্ছি না আমরা। ”
 
ওই এলাকার মানুষেরা বলেন, না খেয়ে মারা গেলেও আইনিভাবে কারো কাছে বলার বা অধিকার আদায়ের সুযোগ নেই এদেশের মানুষের। আবার খাদ্যে ভেজাল, অনিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টিহীন খাদ্য সমস্যায় রয়েছে অধিকাংশ মানুষ। বেঁচে থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা দ্বারা খাদ্য অধিকার সংরক্ষিত করা হলে মানুষের এই অধিকার বলবৎ করতে হবে।
 
এই বিষয়গুলো মাথায নিয়ে “খাদ্য অধিকার আইন-২০১৬” এর একটি খসড়া তৈরি করেছে আইন কমিশন। আইনটির প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে কমিশনের সদস্য বিচারপাতি ফজলে কবির বলেন, “সংবিধানে মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সংবিধানে আছে তবে কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে সেই অধিকার বাস্তবায়িত হবে সেটা আমাদের দেশে নাই। তাই আমরা নানা বিষয় মাথায় নিয়ে একটি খসড়া তৈরি করেছি। সেখানে সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া এসেছে কিনা তার জন্য আপনাদের কথা শুনতে এসেছি আমরা”।
 
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফুল হক বলেন, ‘জলবায়ূ পরিবর্তন ও নানা সমস্যার জন্য মানুষের খাদ্য ও নিরাপদ পানি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে খাদ্য কিনছি, তবে তার মধ্যে ভেজাল একটি বড় বিষয়। আমার যে যার মত ভেজাল ও পিজারভিটি ব্যবহার করছি। এই বিষয়টি যোগ হওয়া উচিৎ। ’
 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য সরবরাহ করাটার বিষয়টি আইন বাধ্যবাধতা তৈরি করতে হবে। মাছসহ অনেক পুষ্টিকর খাবারে এখন আমরা ভাল করছি। এই খাবার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং আমাদেরকে বেশি দামে এই জিনিস কিনতে হয়। আবার খারাপ খবার আমদানি করা হয়। তাই খাদ্য আমাদানি ও রপ্তানির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। ”
 
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “গরীব মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকারের জায়গাটাকে নিশ্চিত করতে হবে। সাবার জন্য এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগ বা সমস্যার সময় শুধু খাবার দিলে হবে না। সব সময় খাবার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা উচিৎ। খাদ্য মানুষের মৌলিক বিষয়। একদিকে অনেক মানুষ খাদ্য পাচ্ছে না, অন্যদিকে আমরা নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছি না।  আইনের মাধ্যমে মানুষের খাবার পাবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। ”
 
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হক বলেন, “আমাদের দেশের সরকার মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ নেন। তবে সেটির আইনি বাধ্যবাধকা নেই। সংবিধান খাদ্য অধিকার নিয়ে সামগ্রিক কথা বলেছেন। তবে এর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কালকে যদি সরকার বয়ষ্ক ভাতা বন্ধ করে দেন তবে কারো কিছু বলার থাকবে না। যদি আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে তবে সেটি বন্ধ করা যাবে না। ভারতে এই বিষয়টা আছে। ”
 
তিনি আরো বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য সরকারকে খাদ্য নিরাপত্তায় নেওয়া উদ্যোগগুলোকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা। আইনে আমরা প্রান্তিক মানুষ, নারী, শিশুদের বিষগুলো গুরুত্ব দিয়েছি। এই আইনে দেওয়া হচ্ছে নারী ও শিশুদের। যারা গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ও পুষ্টি দেওয়ার দায় ও দায়িত্ব সরকারের। জন্মপরবর্তী শিশু ও মায়ের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা করতে হবে। আমর একটি তথ্য ভাণ্ডার তৈরির কথা বলেছি। যেখানে প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের তথ্য থাকবে। তারা খাদ্য নিয়ে সঙ্কটে পড়লে সরকার তার খাদ্য অধিকার নিচ্ছিত করতে বাধ্য থাকবেন। ”
 
এদিকে দেশের খাদ্য অধিকার নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ পর্যালোচনা করে দেখেছে, খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশে কোনো আইনি কাঠামো না থাকায়  দারিদ্রপীড়িত মানুষের রাষ্ট্রের কাছে দাবি করার কোন জায়গা নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়লেও কৃষিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উদ্বেগের বিষয় যে ৭ম পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনায় কৃষি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যথেষ্ট রক্ষণশীল উপায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি ও নীতি কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে খাদ্য অধিকার বিষয়ক একটি আইনি কাঠামো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।


মন্তব্য