kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাবি শিক্ষক আকতারের স্মরণে শোকসভা

‘বোনকে ফিরে পাওয়া সম্ভব না, মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫৪



‘বোনকে ফিরে পাওয়া সম্ভব না, মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই’

‘আমার বোন মারা গেছে, তাঁকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণ সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক যে চিত্র সেটা সবার সামনে আসবে, এটাই আমি আশা করছি।

আমি আমার বোনের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। ’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আয়োজিত শোকসভায় এ প্রতিক্রিয়া জানান তাঁর ছোট ভাই কামরুল হাসান রতন। তিনি আকতার জাহানের মৃত্যুর পরে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। বাকরুদ্ধ এ মানুষটি বোনের মৃত্যুর ঘটনায় সবার সহযোগিতা চেয়ে আর কোনো কথা বলতে পারেননি। আজ রবিবার দুপুর ১২টায় বিভাগের ১২৩ নম্বর কক্ষে এ শোকসভার আয়োজন করা হয়।

বলতে গিয়েও কথা বলতে পারছিলেন না বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিহুর রহমান। ডায়াসের সামনে শুধু অঝোরে কাঁদছিলেন। কিছুক্ষণ পর কিছুটা নিজেকে সামলে স্মরণ করলেন সবার প্রিয় আকতারকে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন দ্বিতীয় বর্ষে, তখন জলি প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়। আমি ওষুধ খেয়েছি কিনা, কতদিন ধরে খাচ্ছি, অন্য কোনো সহকর্মী এটা করে না। জলি শুধু যে আমার সঙ্গেই এমনটা করে তা নয়। সবার সঙ্গে পেশার বাহিরে ব্যক্তি সম্পর্ক রেখে গেছে জলি। ’

সভায় আকতার জাহানের বড় বোন ইসরাত জাহান বলেন, ‘আমরা দুই বোন এক সাথে বড় হয়েছি। পিঠাপিঠি ছিলাম তো। আমি দেশের বাইরে ছিলাম। যাওয়ার আগে সোয়াদকে (আকতার জাহানের ছেলে) নিয়ে আলোচনা হয়েছে যে গণিতে সে একটু দুর্বল ছিল, কীভাবে সে ভালো করবে। যার বাচ্চাকে নিয়ে এত উদ্বিগ্নতা, সে এ ধরনের একটা...। ’ তিনি আর কিছু বলতে পারেননি।

রাবি শিক্ষক আকতারের আদর্শকে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফয়জার রহমান বলেন, তিনি স্পষ্ঠভাষী ছিলেন। কথাবার্তা, আচার-আচরণে অমায়িক ছিলেন। এখন আমাদের একটাই করণীয়, তার নীতি আদর্শের ভালো গুণগুলো আমাদের ধারণ করতে হবে। তাহলে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

‘কী পরিস্থিতি হয়-একটা মানুষ আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত যখন নেয়? কী হয়েছিল জলির! তাঁকে একাকিত্ব বোধ করতে হয়েছিল কেন? সম্পূর্ণ একা না হয়ে পড়লে কেউ আত্মহত্যা করতে পারে না। বিচার অবশ্যই চাই। প্রত্যেকটি আত্মহত্যাই হত্যাকাণ্ড’-বলেন আকতারের সহকর্মী সেলিম রেজা নিউটন।

শোকসভায় সংহতি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম বলেন, ‘আমরা কেন আকতার জাহানের অভিমান বুঝতে পারিনি, এটা আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা। এ মৃত্যুতে যদি কোনো প্ররোচনাকারী থাকে, তার বিচার চাই। তিনি শুধু আকতার জাহানকে হত্যা করেননি, তার স্বপ্নকে হত্যা করেছেন। ’ 

তিনি জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জানতে চাওয়া হবে, শিক্ষকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় কেন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি? এছাড়া তাঁরাও সহকর্মীর স্মরণে একটি শোকসভার আয়োজন করবেন বলে জানান।

শোকসভায় আরো বক্তব্য দেন ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়া, মহিলা পরিষদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাধুরী রায় চৌধুরী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের রফিকুল ইসলাম, আতিকুর রহমান, তৃতীয় বর্ষের হোসাইন মিঠু।  

এর আগে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল ‘আকতার জাহানের সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য’ শিরোনামে জলি’র জীবনী পাঠ করেন। সভাচলাকালে আকতার জাহানকে নিয়ে একটি স্লাইডশো প্রদর্শন করা হয়। সভায় বিভিন্ন বিভাগের দুই শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

তার আগে সাড়ে ১১টায় বিভাগের সামনে থেকে একটি শোকযাত্রা বের করা হয়। শোকযাত্রাটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সেখানে ফিরে আসে। এ সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কালোব্যাজ ধারণ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের নিজ কক্ষ থেকে আকতার জাহানকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ও চিকিৎসকের ভাষ্য, তাঁর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এদিকে শিক্ষকদের অনাস্থার পর বিভাগের শিক্ষার্থীরাও আকতারের সাবেক স্বামী ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর আহমদের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। শোকসভার পরে শিক্ষার্থীরা বিভাগের সভাপতি বরাবর লিখিত আবেদনে নিজেদের এ অবস্থানের কথা জানান। আবেদনপত্রে বিভাগের ১৮০ জন শিক্ষার্থী স্বাক্ষর করেন।

আবেদনপত্রে বলা হয়, সম্প্রতি আমাদের বিভাগের মা তুল্য শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহানের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের শিক্ষক আকতার জাহানকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের কথা। এ নির্যাতনের সঙ্গে তাঁর সাবেক স্বামী ও বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর আহমদের জড়িত থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এমনকি আকতার জাহানের জানাজা সম্পন্ন হওয়ার আগেই তানভীর আহমদ অত্যন্ত নগ্নভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ম্যামের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করেন, যা আমাদেরকে অত্যন্ত মর্মাহত ও ব্যথিত করেছে।  

প্রসঙ্গত, সহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর ১৬ জন শিক্ষক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর আহমদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে অনাস্থা প্রকাশ করেন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত অ্যাকাডেমিক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সহকর্মীদের অনাস্থার মুখে এক পর্যায়ে তানভীর আহমদ নিজেই অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেন।


মন্তব্য