kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঈদ আনন্দে স্বপ্নের সেতুতে সূর্য দেখা

জামালপুর প্রতিনিধি   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৯:১৩



ঈদ আনন্দে স্বপ্নের সেতুতে সূর্য দেখা

জামালপুর জেলার ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ৫৬০ মিটার দীর্ঘ দুইটি সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্তির পথে। ইসলামপুরবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে ওই স্বপ্নের সেতু দুটির উপর এ বছর ঈদ আনন্দে মেতে উঠেছে স্থানীয় নারী পুরুষ ও শিশুরা।

প্রতিদিন শতশত মানুষ ওই স্বপ্নের সেতুতে দাঁড়িয়ে ব্রহ্মপুত্রের মুক্ত হাওয়া উপভোগ এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্য দেখতে ভীড় করছেন। শুধু তাই নয়, সেতু ও রাস্তা নির্মাণের জন্য ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, শেরপুর, শিব্রর্দী ও মেলান্দহ উপজেলা সমূহের দশ লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ইসলামপুর উপজেলা শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের কারণে বরাবরই বিচ্ছিন্ন ছিল ওই উপজেলার গাইবান্ধা, গোয়ালেরচর, চরগোয়ালিনী ও চরপুটিমারী ইউনিয়ন। একই কারণে ইসলামপুর উপজেলা শহরটি সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ছিল পাশর্^বর্তী বকশীগঞ্জ, শেরপুর, শিব্রর্দী ও মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়ন থেকে। এতে ৫টি উপজেলার প্রায় দশ লাখ মানুষ স্বাধীনতার ৪৫ বছর ধরে এ পথে চলতে গিয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগে পড়েছেন। ওই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য বিগত সরকারগুলোর কাছে বহুবার আবেদন জানিয়েও সুফল পায়নি।

সবশেষে এলাকাবাসীর দাবীর মুখে স্থানীয় এমপি ফরিদুল হক খান দুলাল ২০১৩ সনের প্রথম দিকে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ৫৬০ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের দাবী জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর শীঘ্রই দুইটি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই সুবাদে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ২০১৩ সনের ২২ নভেম্বর তারিখে ২০৪ কেটি ব্যায়ে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ৫৬০ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু এবং প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করে।

সেতু দুটির মধ্যে একটি সেতুর নির্মাণ শুরু হয় ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর মেলান্দহের ডেফলা ঘাট এলাকায় এবং অপর সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ইসলামপুরের পাইলিং ঘাট এলাকায়। জামালপুরের এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এইচসিআইএল এবং টিসিসিএল এর মাধ্যমে সেতু দুটির উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করছেন। সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পরেই সেতু দুটির সংযোগ থেকে ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সড়কের উন্নয়ন কাজও শুরু হয়।

গত মার্চ মাসের ৬ তারিখে সেতু দুটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। তবে গত তিন বছরে সেতু দুটির নির্মাণ ও সংযোগ সড়ক পাকা করণের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে পৌঁছে গেছে। ওই সেতু দুটির উপর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাতায়াত আজও শুরু হয়নি। তবে এ পথে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষের প্রতিদিনের দুর্ভোগ লাঘবে বিগত ঈদুল আজহার আগে সেতু দুটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সেতুর উপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ কিছুটা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আর সেদিন থেকেই শতশত মানুষ এসে ভীর করছেন সেতু দুটির উপর। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরা এ অঞ্চলের বাসিন্দারা ঈদের দিন থেকে প্রতিদিনই বেড়াতে আসছেন স্বপ্নের সেতুতে।

ইসলামপুরের পাইলিং ঘাট এলাকায় নির্মিত সেতুর উপর ঈদের পরদিন ঘুরতে আসা সিরাজাবাদ গ্রামের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী তানিয়া আক্তার অজন্তার এর সাথে কথা হয়। সে তার বান্ধবীদের সাথে নিয়ে দলবেঁধে এসেছে সেতুতে বেড়াতে। অজন্তা বললো, আমাদের এদিকে কোনো বেড়ানোর জায়গা নেই। প্রায় প্রতিদিনই আসি। খুব ভালো লাগে। পরিবেশটা খুবই ভালো। বিকেলের সময়টাও কাটলো। বেড়ানোও হলো। সেই সাথে সেতুর উপর দাড়িয়ে সূর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্যটা দেখা হলো। ছেলেরা এখানে কিছু সমস্যা করে। তাই আমরাও দলবেঁধে আসি। এছাড়া এখানে আর কোনো সমস্যা হয় না।

একই সেতুতে দেখা হয় ছোট্ট শিশু ফাইজার সাথে। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তার বাড়ি স্থানীয় দড়িয়াবাদ গ্রামে। চাচা ও ফুফুদের সাথে বেড়াতে এসেছে। ফাইজা বেড়াতে এসে খুব খুশি। সে বললো, নতুন ব্রিজ তাই দেখতে আসছি। এখনে অনেক মানুষ আসে। নদী আছে। পরিবেশ ভালো। সুন্দর লাগে। তার সাথে থাকা আরেক শিশু নুজ্জাত তারান্নুম তাসনিম ঐতীও একই কথা বললো। সে বললো, আমরা সবাই কয়েকদিন ধরে এখানে ঘুরতে আসি। ব্রিজ দেখি, নদী দেখি, লাল সূর্য দেখি। খুব মজা লাগে।

সেতুর উপর চটপটি বিক্রি করছিলেন মনজুরুল ইসলাম। তার বাড়ি স্থানীয় চরচাচিয়া গ্রামে। তিনি আগে ট্রেনে ফেরি করে বাদাম বিক্রি করতেন। সেতু হওয়ার পর থেকে এখানে চটপটি, মুড়ি ভর্তা বিক্রি করে বেশ ভালোই আয় হচ্ছে তার। বেড়াতে আসা সব বয়সী দর্শনার্থীরা তাকে ঘিরে রাখে সব সময়। মনজুরুল ইসলাম বলেন, “আগে বাদাম বেইচা সংসার চলতো না। সেতু হওয়ায় আমগরে ভালোই হইছে। প্রতিদিনই এখানে দোকান করি। বিক্রিও ভালো হয়। ঈদের কয়েকদিন ধরে এক হাজার টাকা পর্যন্ত কামাই হইছে। ঈদ ছাড়াও বেচা হয় প্রতিদিন ৫০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। ”

ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ডেফলা ঘাট সেতুর উপর বেড়াতে আসা সামছুদ্দিন হোসেন ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বাড়ি মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নে। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে স্ত্রী শারমিন আক্তারকে নিয়ে সেতুতে বেড়াতে এসেছেন। সামছুদ্দিন হোসেন বললেন, খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে বিকেল শেষ বেলাটা। এখানে সেতুর উপর দাড়িয়ে সূর্যাস্তের অপরুপ দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়াও অনেকের সাথেই দেখা হয়। এখানকার নদী, নৌকা, দূরের ছবি ও লাল সূর্য সবাই ভালো লাগে। শারমিন আক্তার বললেন, আমাদের তো বেড়ানো তেমন জায়গা নেই। এই সেতু হয়ে ভালোই হয়েছে। আমরা এখন মাঝেমধ্যেই এখানে আসি। বিকেলবেলা খুব মজা হয়।

এব্যাপারে স্থানীয় এমপি আলহাজ ফরিদুল হক খান দুলাল জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের উপর দুটি সেতু নির্মাণের জন্য তিনি ইসলামপুরবাসীকে কথা দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ইসলামপুরবাসীর যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য ২০১৩ সনের প্রথম দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর দুটি সেতু দুটি সেতু নির্মাণের দাবী জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি সেতুই নিমাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা শতভাগ বাস্তবায়ন করেন। আর সে কারণেই আজ ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ২০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি সেতু এবং ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২ কিরোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে।


মন্তব্য