kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঈদ উপলক্ষে ফুলবাড়ীর প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মোটাতাজাকৃত ৪০০ গরু

আবদুল কাদির, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৭:১৭



ঈদ উপলক্ষে ফুলবাড়ীর প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মোটাতাজাকৃত ৪০০ গরু

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার এক আদিবাসী পল্লী আলাদিপুর। এক সময় এই গ্রামের কয়েক শত আদিবাসী সাঁওতাল পরিবার প্রকৃতির উপর নির্ভর করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করত।

বলা যায়, তারা ছিল প্রকৃতির সন্তান। কিন্তু কালক্রমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে এক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। গত কয়েক বছর ধরে আলাদিপুর আদিবাসী সাওতাল পল্লীতে ব্যাপক আকারে শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটা তাজাকরন কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় গবাদিপশু লালন পালন করে ভাল লাভ হওয়ায় আদিবাসীদের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরন কর্মসূচি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে অনেকেই সচ্ছলতা অর্জন করায় তাদের খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, পোশাক-আশাক ও চলনে বলনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। বর্তমানে প্রতি বছর কোরবানির ঈদ ও রোযার ঈদকে ঘিরে এ গ্রামে চলে গরু মোটাতাজাকরনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ।

গতকাল বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) দুপুরে ফুলবাড়ী উপজেলার পূর্ব আলাদিপুর গ্রামে গেলে চোখে পড়ে গরুর যত্ন-আত্তি নিয়ে আদিবাসী কিষাণ-কিষাণীদের মধ্যে নানা ব্যস্ততা। কথা হয় ওই গ্রামের সোম কিচকু (৫২) এবং শেফালী মার্ডি (২৮) দম্পতির সাথে। মাঝারি আকারের একটি ষাঁড়ের গা ধুয়ে দিতে দিতে শেফালী মার্ডি বলছিলেন এ বছর কোরবানির ঈদে বিক্রির আশায় প্রায় ৪ মাস আগে হাট থেকে ঋণের ৩২ হাজার টাকায় একটি এড়ে বাছুর কিনেছিলেন। সেটি এখন বিক্রির উপযুক্ত হয়েছে। বর্তমান বাজারে দাম হতে পারে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। ২০১৪ সাল থেকে তারা গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করছেন। এর আগে আরো দুদফায় তারা ৪৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ১৩ হাজার টাকা মুনাফা করেছেন। মুনাফার টাকায় তারা এখন একটি মুদি দোকান দিয়েছেন।   

কথা হয় একই ইউনিয়নের রাঙ্গামাটি গ্রামের নীলমনি হাসঁদার (৩৬)’ সঙ্গে। তিনি জানালেন, ২০১৪ সাল থেকে এবার নিয়ে পঞ্চমবারের মত তারা গরু মোটাতাজাকরনের কাজ করছেন। প্রথমবার ১৭ হাজার টাকায় একটি এঁড়ে বাছুর কিনে ৪ মাস পর ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে লালন পালনের খরচ বাদে তার লাভ হয়েছিল ৭ হাজার পাঁচশ টাকা। ২য় বার ১৯ হাজার টাকায় একটি এঁড়ে বাছুর কিনে ২৮ হজার ৭শ’ টাকায় বিক্রি করেন। ৩য় দফায় ২০ হাজার ৫শ  টাকায় একটি এড়ে বাছুর কিনে বিক্রি করেন ৩১ হাজার টাকা ও ৪র্থ ধাপে ২১ হাজার ৫শ টাকায় একটি এড়ে বাছুর কিনে ৪ মাস লালন পালনের পর ৩২ হাজার বিক্রি করেন। বর্তমানে ৬০ হাজার টাকায় দুটি এড়ে বাছুর কিনে পঞ্চমবারের মত গরু মোটাতাজাকরনের কাজ করছেন।

আদিবাসী সাওতাল কিষানি নীলমনি হাসঁদা বলেন, প্রতিদিনের খাবার হিসেবে ফিড, ধানের গুড়া, চোপড়, খড় ও নেপিয়ার ঘাস বাবদ প্রতি মাসে একটি গরুর পিছনে প্রায় ১ হাজার ৫শ’ টাকা এবং ৪ মাসে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতিটি গরু থেকে গড়ে তার লাভ থাকে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।

নীলমনি হাঁসদার স্বামী পল্টন কিস্কু (৪২) বলেন, গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগে আমরা স্বামী স্ত্রী মিলে মাঠে মজুরের কাজ করতাম। বর্তমানে আমি রিক্সা-ভ্যান চালাই, আর আমার স্ত্রী, গরুর যতœ আত্তি দেখভাল করেন।

নীলমনি হাঁসদা বলেন, আমাদের ভিটে-মাটি ছাড়া আবাদী কোন জমি নেই। লাভের টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনেছি। সেখান থেকেও কিছু আয় হয়। স্বামী-স্ত্রীর আয়ের টাকায় আমাদের সংসার চলে। আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে সেলিনা কিস্কু (১৫) ১০ম শ্রেনিতে, ছেলে মিলন কিস্কু (১৩) ৭ম শ্রেণিতে ও ছোট মেয়ে মেরলি কুইন কিস্কু (৮) ২য় শ্রেণিতে পড়ছে। স্বামী-স্ত্রীর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দুই ছেলেকে ডাক্তার ও মেয়েকে নার্স বানাবেন।

বর্তমানে তাদের আয় বাড়ায় তারা গরু থাকার ঘরে টিনশেড দিয়ে মেঝে পাকা করেছেন। আগে অন্যের মোবাইল থেকে জরুরী কথা-বার্তা বলতেন। এখন স্বামী-স্ত্রী দুজনই আলাদা আলাদা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। আগে পাড়ার নলকুপের পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতেন। এখন নিজের বাড়িতে নলকুপ বসেছে, সংযোগ নিয়েছেন বিদ্যুতেরও।

জানা গেছে, গরু মোটাতাজাকরন কর্মসূচির আওতায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের পূর্ব আলাদিপুর ও রাঙ্গামাটি আদিবাসী পলীর প্রায় ৭৩০ পরিবার এক থেকে ৪টি পর্যন্ত গরু লালন-পালন করছেন। ২০১৪ সালে এ কর্মসূচি চালুর পর বিভিন্ন পরিবার এপর্যন্ত ৭২৫ টি স্বাস্থ্যবান ষাঁড় (এড়ে গরু) বিক্রি করেছেন। এবারের ঈদেও প্রায় চারশ বিক্রয় উপযোগী ষাঁড় গরু প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রকল্পের সুবিধাভোগিরা জানান, এসব গরুর বিশেষত্ব হলো- কোন ক্ষতিকর হরমোন ইনজেকশন বা রাসানিক দ্রব্য ব্যবহার না করেই সম্পূর্ন প্রাকৃতিক (অর্গানিক) খাবার খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা হয়। অন্যদিকে, কিছু অতি মুনাফালোভঅ ব্যক্তি এ কাজে মানব স্বাস্থ্য ও গবাদিপশুর জন্য মারাত্ত্বক ক্ষতিকর হরমোন ইনজেকশন ও ভারতীয় মোটাতাজা করন ট্যাবলেট ব্যবহার করেন। এতে কৃত্রিম উপায়ে মোটা-তাজা করা গরুর প্রতি দেশের সাধারন মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়েছে।  

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় একটি বেসরকারী সংস্থা। এতে কারিগরি, প্রযুক্তিগত, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাদ্যের সমমূল্যের নিশ্চয়তা ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করছে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন। কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে সুইজারল্যান্ডের হেক্স-ইপার নামে একটি দাতা সংস্থা।

ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ওয়ালী-উল-ইসলাম বলেন, ফুলবাড়ীর আলাদিপুর ইউনিয়নের গবাদিপশু মালিকরা গরু মোটাতাজা করে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছেন। তবে প্রয়োজন ছাড়াই যদি গবাদিপশুর উপর অতিমাত্রায় স্ট্রয়েড জাতীয় ইনজেকশন ও ভারতীয় মোটা-তাজা করন ট্যাবলেট প্রয়োগ করা হয় সেসব গবাদিপশুর লিভার, কিডনি ও হৃদপিন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিজের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া এধরনের গরুর মাংস নিয়মিত খেলে মানব দেহের জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে।  

২০১৪ সাল থেকে ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের দু’টি গ্রামে আদিবাসী সাওতাল ও দলিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত প্রায় সাড়ে ৭শ পরিবার প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু মোটা-তাজা করে আর্র্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।


মন্তব্য