kalerkantho


চেয়ারম্যান ওপেনে, মেম্বার গোপনে

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ২০:১১



চেয়ারম্যান ওপেনে, মেম্বার গোপনে

বৃহস্পতিবার ঠিক সকাল সাড়ে ৯টা। ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের উত্তর মুরাদ ছবুল্যাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে ভোলা-লক্ষীপুর-চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে মানুষের জটলা দেখে পুলিশবাহিত দুইটি মাইক্রোবাস থেকে ৬-৭ জন পুলিশ নেমে বাঁশি বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা করে দেয়। ভোটকেন্দ্রের সামনে তখন নারী-পুরুষ ভোটরদের দীর্ঘ লাইন। সেখানেও বেশ কয়েকজন পুলিশ ও আনসার ভোটারদের লাইনে দাঁড় করানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।

ভোটকেন্দ্রের বাইরের এ দৃশ্য দেখে যেন মনে হচ্ছে এ কেন্দ্রে অবাধ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে ভোটগ্রহণ চলছে। কিন্তু কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ যেন তার উল্টো। কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটি বুথে বিশৃঙ্খল পরিবেশ। হৈ-চৈ, আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীদের চেঁচামেচি। দেখে মনে হচ্ছে যেন এটা কোনও এক মাছ বাজার। মহিলা বুথটি ঘিরে রেখেছে আওয়ামী লীগের তিনজন কর্মী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীর এজেন্ট কার্ড বুকে ঝুলানো আলাউদ্দিন নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী ভোটারদের কাছ থেকে চেয়ারম্যানের ব্যালট পেপার হাতে নিয়ে নিজেই প্রকাশ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী হাসনাইন আহম্মেদ হাসানের নৌকা প্রতীকে সিল মারছেন।
আর বাকি মেম্বার প্রার্থীর দুইটি ব্যালট পেপার ভোটারদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তার এ কাজে সহায়তা করছেন সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্ট। জানতে চাইলে ভোটাররা চুপ।
আওয়ামী লীগ কর্মী আলউদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, এখানে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ভোট ওপেনে, আর মেম্বার প্রার্থীদের ভোট গোপনে দেওয়া হচ্ছে। পুরুষ বুথেও দেখা গেছে একই চিত্র। ওই বুথে নুরে আলম নামে চেয়ারম্যান প্রার্থীর এক কর্মী একইভাবে ভোটারদের কাছ থেকে চেয়ারম্যান পদে ব্যালট নিজে হাতে নিয়ে প্রকাশ্যে সিল মেরে বাক্সে ঢুকাচ্ছেন। আর মেম্বার প্রার্থীর ব্যালট ভোটারদের হাতে দিয়ে দিচ্ছেন। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার নাজিউর রহমান কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে দেখা গেছে একটি কক্ষের ভেতর থেকে লক করে কক্ষের ভেতরে একা বসে রয়েছেন।
জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, কি আর বলবো ভাই, দেখতেইতো পারছেন। বুঝতেইতো পারছেন। আমরা অসহায়। তিনি আরো বলেন, এ কেন্দ্রে চেয়ারম্যান পদে ওপেন ভোট হচ্ছে। তবে, মেম্বার পদে গোপনে ভোট হচ্ছে। প্রিজাইডিং অফিসার আরো বলেন, এ কেন্দ্রে যেখানে ৪টি বুথ হওয়ার কথা সেখানে ১০টি বুথ করা হয়েছে। তাই বিশৃঙ্খলা বেশি হচ্ছে। কেন্দ্রে মোট চার হাজার ৮ ভোটের মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সাত শো’র মত কাস্ট হয়েছে।

সাড়ে ১০টার দিকে ওই ইউনিয়নের চর আনন্দ পার্ট-৩ কেন্দ্রেও দেখা গেছে প্রায় একই চিত্র। ভোটাররা অভিযোগ করে জানান, এ কেন্দ্রে নৌকা ওপেনে, আর মেম্বার গোপনে ভোট হচ্ছে। প্রিজাইডিং অফিসার বাংলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মেহেদী হাসানও বলেন, এ কেন্দ্রে  চেয়ারম্যান পদে ওপেন ভোট হচ্ছে। তবে, মেম্বার পদে গোপনে ভোট হচ্ছে।

১১টা ২০ মিনিটের সময় একই ইউনিয়নের উত্তর চর আনন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে সেই একই চিত্র, একই দৃশ্য। চেয়ারম্যান পদের ব্যালট নিয়ে প্রকাশ্যে সিল মারছেন কর্মী-সমর্থকরা। আর মেম্বার ব্যালট ভোটারদের হাতে দেওয়া হচ্ছে। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ভেদুরিয়া সমবায় বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ হানিফ বলেন, এখানে চেয়ারম্যান পদে ওপেন হচ্ছে। তবে, মেম্বার পদে শতভাগ সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভোট হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন রাজাপুরের কয়েকটি কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট হলেও দুপুরের পর থেকে ওই সব কেন্দ্রেও চেয়ারম্যান পদে ওপেনে ভোট হয়েছে। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

এ ব্যাপারে ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী তোফায়েল হোসেন জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট সম্পন্ন হয়েছে।

জেলার লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন রাব্বী অভিযোগ করে জানান, ওই ইউনিয়নেও চেয়ারম্যান পদে ওপেন ভোট হচ্ছে। তাই তিনি ভোট বর্জন করে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। ভোলার চার উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

ছবি সংযুক্ত ঃ ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের চর আনন্দ পার্ট-৩ ভোটকেন্দ্রে মহিলা বুথে এভাবেই চেয়ারম্যান পদে প্রকাশ্যে সিল মারা হচ্ছে।    


মন্তব্য