kalerkantho


গণমাধ্যম সংলাপ

সাতক্ষীরায় নদী তীরবর্তী নারী ও শিশু বিপদাপন্ন

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি    

২৯ মার্চ, ২০১৬ ১৯:৩৫



সাতক্ষীরায় নদী তীরবর্তী নারী ও শিশু বিপদাপন্ন

"জলাবদ্ধতার সময় নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় জন্ম নেওয়া শিশুরা প্রতিবন্ধী হয় অথবা পুষ্টির অভাবে দৈহিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

শরীরের হাড় চিকন হয়ে যায়। গর্ভবতী মা ও নবজাতকসহ সব বয়সের মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। জলাবদ্ধতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নদী তীরবর্তী মানুষের এ বিপদাপন্ন অবস্থা চলতে থাকে। "

সাতক্ষীরায় বেতনা নদী ও নদী তীরবর্তী নারী ও শিশুর প্রাণ প্রবাহের দাবিতে আয়োজিত গণমাধ্যম সংলাপে ভুক্তভোগী মানুষ এভাবেই প্রকাশ করেন জলবদ্ধতাকালীন অবস্থাসহ তাদের সুখ-দুঃখের কথা। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাছখোলা মাঝের পাড়ায় আন্তর্জাতিক পানি দিবস উপলক্ষে নদী তীরবর্তী এলকার মানুষ এসব কথা বলেন। ‌আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিম এ গণমাধ্যম সংলাপের আয়োজন করে।  

সংলাপে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী, কল্যাণ ব্যানার্জি, মিজানুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, মো. আসাদুজ্জামান, হাফিজুর রহমান মাসুম, শেখ তানজির আহম্মেদ প্রমুখ।
এ সময় উপস্থিত থেকে সংলাপে অংশ নেন এলাকার শতাধিক মানুষ।

সংলাপে বেতনা পাড়ের বাসিন্দা রহিমা খাতুন, হাসিনা খাতুন, অঞ্জলি বিশ্বাস জানান, নদী ভরাট হয়ে বেতনা পাড়ের পানি নিষ্কাশন হয় না।

ফলে প্রতিবছর ছয় মাস ধরে এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা থাকে। এলাকাটি পানিতে ডুবে থাকায় বেতনা তীরে কোনো ফসল নেই। ফলজ ও বনজ বৃক্ষসহ সব ধরনের গাছ-গাছালি মরে গেছে। ইচ্ছে থাকলেও হাঁস-মুরগি গবাদি পশু পালনেরও সুযোগ হারিয়ে গেছে। যে বেতনা তীরে কর্মসংস্থানের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, সেই বেতনার দুই পাশের মানুষ কাজ না পেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

সংলাপে আরো বলা হয়, এখন নদীতে নৌকা চলে না। জেলে পাড়ার মানুষ এখন মাছ ধরার কাজ বন্ধ করে নাপিতের কাজ করে। কাজের খোঁজে মানুষ পেশা বদল করেছে। জলাবদ্ধতাকালে শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। সবাই ঘর-বারান্দায় বন্দি হয়ে থাকে, চারদিকে বিষাক্ত পানি। এ পানিতে চলাফেরা করলে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ে। মাছখোলা গ্রামের নাজমা বেগম, আয়শা খাতুন, রাবেয়া, জেসমিনসহ এলাকাবাসী বলেন, "নেতারা জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেন। ক্ষমতায় এসে পরে সব ভূলে যায়। কিন্তু কাজ আর করে না।
ওই নারীরা জানান, ভোটের সময় রাজনৈতিক নেতারা নদীপাড়ের এসব জনগোষ্ঠীকে তুরুপের তাস মনে করেন। বছর তিনেক আগে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বেতনা নদী খনন শুরু করেছিল সরকার। আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। খননের নামে তামাসা করা হয়েছে। দুর্নীতি হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে  আবারও পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে গেছে বেতনার। বর্ষা মৌসুমের আগে এ খনন কাজ চালালেও বর্ষার শুরুতেই দুই পাশের মাটি ধসে পড়ে বেতনা নদী পুরনো চেহারায় ফিরে গেছে। এ নিয়ে গ্রামবাসী আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তাদের এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ফের খনন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন।

সংলাপে আগত নারীরা আরো বলেন, "বেতনার দুই তীর প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। চরজুড়ে তারা বাড়ি-ঘর ইটভাটা তৈরি করায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। " বেতনা পাড়ের অধিবাসী বৃদ্ধ মোকছেদ আলী বলেন, ছাগলার গেইটসহ কয়েকটি স্লুইস গেইট দিয়ে এখন আর পানি নিষ্কাশন হয় না।   নদীর তলদেশ গেইট অপেক্ষা উঁচু হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, "এখন চারপাশে ছোট ছোট পকেট ঘের করে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

পয়ঃনিষ্কাশন একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে ভুক্তভোগীরা বলেন, "আমাদের এলাকায় কোনো স্থায়ী পাকা পায়খানা নেই। বিশেষ করে নারীদের সমস্যা খুব বেশি। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও ইউনিয়ন পরিষদ কিছু কিছু কাজ করলেও তা আমাদের চাহিদা মেটাতে পারেনি। পানির কবল থেকে বেচে থাকার জন্য নিজ উদ্যোগে ভিটে মাটি উঁচু করতে হয়েছে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলো তা পেরে উঠছে না। বেতনা পাড়ের শিশুরা পারিবারিক দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং অন্যান্য কারণে স্কুল ছেড়ে কাজের সন্ধানে এদিক-ওদিক চলে গেছে। এখন এলাকায় কর্মসংস্থানের খুবই অভাব। ক্ষেত নেই, ফসলও নেই। পেয়ারা পেঁপে সজনে কাঁঠালসহ নানা ধরনের ফল-ফলাদির গাছ অকালে মারা গেছে। লবণাক্ততার দাপটে সেখানকার পরিবেশও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বেতনায় যখন প্রাণ ছিল, তখন জোয়ার-ভাটায় ছোটবড় নৌকা চলাচল করেছে। এখন এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে যাতায়াতের সেই মাধ্যম নেই। জলাবদ্ধতার সময় বাড়ি-ঘর ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিতে হয়।

প্রতিবছরের এই দুর্ভোগ থেকে তারা মুক্তি চান জানিয়ে তারা বলেন, "প্রয়োজনে আমরা সামাজিক আন্দোলন করবো। নারী-পুরুষ সবাইকে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘেরাও করবো। " বেতনা তীরে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি পরিবারে পুষ্টিহীনতা দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, চিকিৎসা করেও কোনো ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

বেতনা খনন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি তুলে গ্রামবাসী বলেন, "বেতনা খননের মাটি ফেলতে হবে নদীর মূল সীমানার বাইরে। তাহলে বৃষ্টিতে ধুয়ে আবার নদীতে পড়বে না। এ ছাড়া বেতনার সঙ্গে সংযুক্ত সকল খাল উন্মুক্ত করে স্লুইস গেইটগুলো সচল করতে হবে। জলাবদ্ধতায় বর্তমানে এলাকায় সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দেয়। টিউবওয়েলগুলোয় লোনা পানি উঠছে। " এসব  ব্যাপারে তারা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

 


মন্তব্য