kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কিস্তি পরিশোধের তাগিদেই বাড়ছে নারী শ্রমিক

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

৯ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৪৮



কিস্তি পরিশোধের তাগিদেই বাড়ছে নারী শ্রমিক

'এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, এগিয়ে যাবেই দেশ'- উন্নয়নের এ স্লোগানের সঙ্গে নারীরাও সম্পৃক্ত। তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব।

অথচ ইদানীং বিশেষ করে রংপুরে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। মজুরি প্রদানে বৈষম্য থাকলেও মূলত ঋণের কিস্তি পরিশোধে এক প্রকার বাধ্য হয়েই সন্তান-সংসার ফেলে শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদেরকে।

তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধসহ রংপুরের চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বাস। এক সময়ের অবস্থাসম্পন্ন এসব পরিবার নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন তিস্তা কূলবর্তী  এলাকাগুলোতে। শ্রম বিক্রিই তাঁদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। বছরের বিভিন্ন সময় এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় পরিবার প্রধানরা কাজের সন্ধানে ছুটে যান ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তারপরও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। ফলে বাধ্য হয়েই নারীরা বেরিয়ে পড়ছেন মাঠে-ঘাটে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার চরাঞ্চলসহ সর্বত্র এখন চলছে আলু, তামাকসহ রবি ফসল উত্তোলনের মহোৎসব। এসব কাজে নিয়োজিত রয়েছেন নারী শ্রমিকরা। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ইচলী চরে এক সঙ্গে আলু তোলার কাজ করছিলেন প্রায় ৫০ জন নারী শ্রমিক। এ সময় হাওয়া বেগম, জরিনা বেগম, জশো মাই, ফেলানী বেওয়া জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে তাঁরা মজুরি পান মাত্র ১২০ টাকা। সমপরিমাণ কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি  দেওয়া হয় ২০০ টাকা।

শংকরদহ চরের আকলিমা, ছুরতন নেছা, সবজান বেগম জানান, সংসার জীবনে এই প্রথম তাঁরা বাড়ির বাইরে মাঠে আলু তোলার কাজে শ্রম বিক্রি করছেন। কারণ জানতে চাইলে আঁচলে মুখ লুকিয়ে বলেন, "প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তির টাকা দিতে হয়। " খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চরাঞ্চলে এমন কোনো অভাবি পরিবার নেই যারা বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ক্ষুদ্র ঋণ নেয়নি। কেউ কেউ একাধিক সংস্থার কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছেন অভাবের কারণে। প্রতি সপ্তাহে ২৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের কিস্তি জমা দিতে হয় তাঁদের।

জয়রামওঝা চরের বিউটি বেগম জানান, মেয়ের বিয়ে দিতে ছয় মাস আগে ব্র্যাকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, "ওমার কামাইয়ে (স্বামীর আয়ে) কোনোমতে খাওয়া চলে। আর নিজের কামাইয়ে ঋণের কিস্তি দেই। " জোবেদা খাতুন বলেন, "মানুষটাতো (স্বামী) বিদেশোত কাম করে। মোকে কাম করি ঋণের কিস্তি দেওয়া নাগে। " মঙ্গার সময় বাঁচার তাগিদে বেসরকারি সংস্থার কাছে ১৫ হাজার টাকা তিনি ঋণ নিয়েছিলেন।

এলাকার ইউপি সদস্য দুলাল মিয়া জানান, বর্তমানে এলাকায় একজন শ্রমিকের মজুরি চলছে ২০০ টাকা। আর নারী শ্রমিক হলে তাঁর মজুরি  দেওয়া হয় ১২০ টাকা। লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান ফয়সাল হাসান জানান, চরাঞ্চলের পরিবারগুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার ঋণের জালে আটকা পড়েছেন। সারা বছরই তাদের সাপ্তাহিক হিসেবে ঋণের কিস্তি  পরিশোধ করতে হয়। মজুরিতে বৈষম্যের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, "ঋণের কারণে দিন দিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। আর মহাজনরা সে সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছেন। "  

 


মন্তব্য