kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কলেজ শিক্ষার্থীদের আনন্দ ভ্রমণ

শেরপুর প্রতিনিধি    

৫ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৩৪



প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কলেজ শিক্ষার্থীদের আনন্দ ভ্রমণ

মধুপুর গড়ের শালবনে অন্যরকম একটি দিন কাটালো শেরপুরে কিছু ছিন্নমূল প্রতিবন্ধী শিশু। গতকাল শুক্রবার আনন্দভ্রমণে নিয়ে তাদের এমন সুযোগ করে দেয় শেরপুর সরকারি কলেজের কিছু উদ্যমী শিক্ষার্থী।

জীবনে প্রথমবারের মতো বনভোজনের স্বাদ পেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে এসব ছিন্নমূল প্রতিবন্ধী শিশুরা।

শেরপুর সরকারি কলেজ ডিবেটিং ক্লাব এবং শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'আর্তনাদ' এ বনভোজনের আয়োজন করে। তাদের এ অন্যরকম আয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় কিছু ফেসবুক বন্ধু। ছিন্নমূল ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে সঙ্গ দিতে শরিক হন শেরপুরের কয়েকজন খেলাঘরকর্মী, উদীচী ও জনউদ্যোগ সংগঠক। শালবনে ঘুরে বেড়ানো, একাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্মৃতি বিজড়িত দোখলা রেস্ট হাউজ ও বিএডিসির বীজ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন, লহরিয়া বীটে বন্যপ্রাণী দেখা এবং বিনোদনমূলক খেলাধুলায় দিনভর আনন্দ ভ্রমণ শেষে অংশগ্রহণকারী সকল শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় শুভেচ্ছা উপহার।

সদর উপজেলার পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের দুই ভাই তিনবোনের মাঝে তৃতীয় আব্দুর রহিম (১২) শহরের একটি হোটেলে শ্রমিকের কাজ করে। আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে সে বলে, "কতো মাইনসে পিকনিকে যায় খালি চাইয়া চাইয়া দেকতাম আর আপছোস করতাম। আমরা গরীব মানুষ, কাম কইরা খাই। পিকনিকে যাওয়ার ট্যাহা নাই। আইজ মনের আশা পূরণ অইছে। খুব মজা অইছে। সবাই মিল্লা খুব আনন্দ-ফুর্তি করছি। " শাপমারী এলাকার ছিন্নমূল শিশু ইসমাইল হোসেন (১৩) বলে, "জীবনে এই পইল্লা (প্রথমবার) পিকনিকে আইছি। খুব বালা লাগছে। ইবা আনন্দ আর কোনোদিনও পাই নাই। বনের মধ্যে ঘুইরা বেড়াইছি, বান্দর দেখছি, হরিণ দেখছি। খাইছি, ঘুরছি, খেলাইছি, পুরস্কার পাইছি, খুব বালা লাগছে। "

শেরপুর সরকারি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নিবাসের শিক্ষার্থী অপু বলে, "খুব মজা হইছে। আমগরে খুব ভালো লাগছে। অন্ধ বইলা কেউতো আর আমগরে পিকনিকে নেয় না। ইবার আমরাও পিকনিক করবার পাইছি। এইটাই আমগরে আনন্দের। "    

ছিন্নমূল এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে বনভোজনের আয়োজক শেরপুর সরকারি কলেজ ডিবেটিং ক্লাবের সাবেক সভাপতি এইচএসসি পরীক্ষার্থী এমদাদুল হক রিপন ও আর্তনাদ সমন্বয়কারী জিহান উদ্দিন বলেন, "ছিন্নমূল ও প্রতিবন্ধী শিশুরা খুবই অসহায়। তাদের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে, তারাও যে আমদের সমাজেরই অংশ, তারা নিজেদের যেন বিচ্ছিন্ন না ভাবে, আমরাও তাদেরকে যেন দূরে ঠেলে না দিই এ জন্যই আমাদের এ আয়োজন। "

জিহান উদ্দিন আরো বলেন, "আমাদের এ আয়োজনে ২০ জন ছিন্নমূল ও প্রতিবন্ধীর সঙ্গে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও কলেজের শহরের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আমাদের সঙ্গে নিয়েছি। আমাদের এ আয়োজনে ফেসবুক বন্ধু চলচ্চিত্র নির্মাতা নূরল ইসলাম রাজা সরকার, ইব্রাহীম রেজা বেলু ভাই, শিবু স্যার, কালাম স্যার, ডালিয়া আপা বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন। এজন্য আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। নিজেদের পড়ালেখার পাশপাশি ভবিষ্যতে এসব শিশুরা ছাড়াও অসহায় শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে। "

শেরপুর সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শিব শংকর কারুয়া বলেন, "ছাত্রদের এ উদ্যোগটি খুবই প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে সামাজিক দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি হয়। সেজন্য তাদের উৎসাহ দিতে আমিও তাদের সঙ্গে বনভোজনে গিয়েছি। তাদের সঙ্গে শরিক হতে পেরে নিজেকে  গর্বিত মনে করছি। "

জনউদ্যোগ শেরপুরের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও উদীচী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু হান্নান বলেন, "আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। প্রতিটি শিশুর জন্যই সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু আমরা অনেক সময় সবদিকে নজর দিতে পারি না। কলেজ ছাত্ররা এর মধ্য দিয়ে একটি মহৎ কাজ করেছে। তাদেরকে উৎসাহ দিতেই তাদের সঙ্গে সময় কাটানো। আমাদেরও দিনটি ভালো কেটেছে, যখন এসব ছিন্নমূল-প্রতিবন্ধী শিশুর মুখে হাসি ফুটতে দেখেছি। আসলে সমাজের এমন অসহায়, পিছিয়ে পড়া, অনগ্রসর শিশুদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো উচিত। "

 


মন্তব্য