kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বোরো লাগানো শেষ পর্যায়ে

চারার খোঁজে ছুটছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষক

স্বপন চেৌধুরী, রংপুর    

৩ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৩৭



চারার খোঁজে ছুটছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষক

'ভালো বীজে ভাল ফলন'- স্লোগানটি আধুনিক কৃষির সঙ্গে যোগ হলেও ফসল আবাদের পূর্বেই প্রস্তুতি হিসেবে বীজ সংরক্ষণ বা চারা তৈরি কৃষকের চিরায়ত ঐতিহ্য। রোপা আমন কিংবা বোরো ধানের চারা রোপনের নির্দিষ্ট সময়ের এক থেকে দেড় মাস আগে কৃষকরা বীজতলায় চারা প্রস্তুত করেন।

আগেকার দিনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমিতে বীজতলা করায় চারার ঘাটতি তেমন হতো না। এখনকার দিনে কৃষকরা জমির স্বল্পতা ও বীজের উচ্চ মূল্যের কারণ হিসেব করেই চারা প্রস্তুত  করেন। তারপরও যদি প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ কোনো কারণে চারার সংকট হয়, সে ক্ষেত্রে অন্য কৃষকের বীজতলা কিনে নিয়ে ঘাটতি মোকাবেলা করাই ছিল রংপুর অঞ্চলের কৃষকের অনেক আগের গল্প।

বর্তমান সময়ের গল্পটা একটু অন্য রকম। কার বীজতলায় চারা আছে, কোন জাতের বীজের চারা কিংবা চারার বয়স কত-এতসব খুঁজে দেখার সময় নেই ব্যস্ত কৃষকদের। তাই কয়েক বছর ধরে উত্তরাঞ্চলের হাট-বাজারে বিশেষ করে আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের চারা কেনা-বেচা হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকসহ বর্গা চাষিরা ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে বাজারে কেনা চারার ওপরই নির্ভর করেন। এ সুযোগকে পুঁজি করে চারার বাজার জমজমাট করে তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।

আরো এক ধাপ এগিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় এ বছর বীজতলা থেকে বোরো ধানের চারা উঠে এসেছে চায়ের দোকানে। প্রতি গণ্ডা (চার মুঠা) চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়।

প্রতিবছর শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে কোল্ড ইনজুরিতে বোরো ধানের চারার ক্ষতি হয়ে থাকে। এ বছর তেমন ক্ষতি না হলেও বোরো আবাদের শেষ সময়ে চারা সংকটের কারণে প্রতিরাতে বীজতলা থেকে চুরি হচ্ছে চারা। দু-একজন কৃষক অনেক কষ্টে চারা রক্ষা করলেও তার দাম আকাশচুম্বি। এ কারণে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

১০ কিলোমিটার দূরের ঠাকুড়াদহ গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে রংপুরের গঙ্গাচড়া বাজারে এসে আব্দুল হক নামের এক কৃষক অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলেন, "বাহে বেছনহাটি (যেখানে চারা কেনা-বেচা হয়) কোনটে? বেছনের ঘাটতি পড়ছেতো!" উপজেলার বড়াইবাড়ী হাটে গিয়ে জানা যায়, চায়ের দোকানে বোরো ধানের চারা বিক্রি হচ্ছে। কৌতুহলবশত ওই দোকানে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা সেখান থেকে কিনে নিচ্ছেন প্রয়োজন অনুযায়ী চারা।

চারা কিনতে আসা মণ্ডলেরহাট এলাকার কৃষক নবীর হোসেন জানান, কোথাও চারা মিলছে না। এখানে প্রতি গণ্ডা চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। প্রতি শতক জমিতে পাঁচ গণ্ডা (২০ মুঠা) চারা প্রয়োজন। পাইকান এলাকার কৃষক ইব্রাহীম আলী জানান, প্রতিবিঘা জমিতে চারা রোপণ করতে প্রায় ৬৬০ মুঠা চারা প্রয়োজন। যার দাম পড়ে তিন হাজার ৩০০ টাকা। দোকানদার আব্দুল জলিল জানান, বীজতলা থেকে চারা চুরি হওয়ায় বিপাকে পড়েন তিনি। তাই তাঁর নিজের তৈরি বোরো ধানের চারা বীজতলা থেকে তুলে চায়ের দোকানে এনে বিক্রি করছেন।

রংপুরের লালবাগ হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির জন্য চারা উঠলেও দাম বেশি হওয়ায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কৃষকরা। এখানেও প্রতিগণ্ডা চারা ২০ টাকার নিচে মিলছে না। চারা কিনতে আসা পার্শ্ববর্তী বড়বাড়ি এলাকার কৃষক ওয়াহেদ আলী জানান, জমিতে রোপণের জন্য তিনি বীজতলা করেছিলেন। কিন্তু ঘন কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে চারা কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, "আলু তুলি (উত্তোলনের পর) ওই জমিত বোরো নাগবার কতা। তয় এত দামে চারা কিনলে হামার পোষবার নয়। "
 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় পাঁচ লাখ দুই হাজার ৫২৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর জেলায় এক লাখ ৩৩ হাজার ৪২৫ হেক্টর, গাইবান্ধা জেলায় এক লাখ ২৫ হাজার ৯৬৭ হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় এক লাখ ৮ হাজার ৭০৪ হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৫১ হাজার ৭৬৭ হেক্টর ও  নীলফামারী জেলায় ৮২ হাজার ৬৬৬ হেক্টর। বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসব জেলায় ২৮ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে।

এক হেক্টরের বীজতলার চারা দিয়ে ২০ হেক্টর জমি রোপন করা সম্ভব। শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় বীজতলায় চারার কিছুটা ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, চারা রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্বে থাকা রংপুরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী জানান, বোরোর চারা রোপণ একেবারেই শেষ পর্যায়ে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার চারার তেমন ঘাটতি নেই। তবে আলু উত্তোলনের পর শেষপর্যায়ে পরিকল্পনা ছাড়াই বোরো চাষ করছেন এমন দু-চারজন কৃষকের চারার ঘাটতি পড়লেও তারা বিভিন্ন স্থান থেকে ম্যানেজ করে নিচ্ছেন। আগামী ১৫ মার্চ বোরো চারা রোপণের শেষ সময় বলেও জানান তিনি।

 


মন্তব্য