kalerkantho

যেভাবে চাকরি পেলাম

বিগত বছরের নিয়োগ পরীক্ষায় আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পড়েছি

মো. শামীম হোসেন
ডেপুটি ডিরেক্টর, ফিন্যান্স বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিগত বছরের নিয়োগ পরীক্ষায় আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পড়েছি

ঢাকা কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরপরই ঠিক করেছিলাম অনার্স শেষ করার পর হয় ঢাবির আইবিএতে এমবিএ করব অথবা বিসিএস দিয়ে অ্যাডমিন ক্যাডারে চাকরি করব। সে লক্ষ্যে অনার্স প্রথম বর্ষের শুরু থেকেই বিসিএস ও ঢাবির আইবিএর খোঁজখবর রাখতে থাকলাম। আমার অনার্স সেশন ছিল ২০০৫-০৬। অনার্স প্রথম বর্ষ শেষ হতেই দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আইবিএতে এমবিএ করতেন। তাঁর কাছে এক দিন পরামর্শ চাইলাম বিসিএস বা আইবিএ কোন বিষয়ে পড়াশোনা করব। তিনি বললেন, যেহেতু সময় আছে বিসিএসের পাশাপাশি আইবিএর প্রস্তুতিটাও নিয়ে নাও। তখন থেকেই সাইফুরস ম্যাথ, ভোকাবুলারি, এনালজি পড়তাম। সঙ্গে বিসিএসের কিছু গাইড বইও পড়েছি। মাধ্যমিক পর্যায়ের বইগুলো আগে থেকেই আয়ত্তে ছিল।

এ ছাড়া বিসিএসের ওপর অনুষ্ঠিত বেশ কিছু সেমিনারে অংশ নিয়েছি।

প্রস্তুতির ব্যাপারে সব সময় সিনিয়রদের পরামর্শ নিতাম।

নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা পড়েছি। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষার পর আইবিএর চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিলাম। কারণ (সেশনজটের কারণে) অনার্স শেষ করতে প্রায় সাত থেকে আট বছর লাগবে। এরপর এমবিএ করে চাকরি খোঁজা অনেক সময়ের ব্যাপার, যা আমার পক্ষে সম্ভব না। তখন আইবিএর পড়াশোনা বাদ দিয়ে শুধু বিসিএস নিয়ে পড়ে রইলাম। কারণ বিসিএসের সুবিধা হলো অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই আবেদন করা যায়। ২০১২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়, যারা সবাই বর্তমানে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওরাসহ ঢাকা কলেজের বন্ধুদের নিয়ে বেশ ভালো একটা গ্রুপ করেছিলাম। সপ্তাহে দুদিন আমরা একসঙ্গে বসতাম। জটিল বিষয়গুলোতে একে অপরকে সহযোগিতা করতাম। রিটেন ও প্রিলির জন্য সব বিষয়ের খুঁটিনাটি নোট করেছি। বাংলা বিষয়ে সৌমিত্র শেখরের ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা’ থেকে সাহিত্য অংশ এবং ব্যাকরণের জন্য শামসুল আলম স্যারের নোট পড়েছি। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ বইটিও চোখ বুলিয়েছি। তা ছাড়া সন্ধি, বানান, ভুল শুদ্ধিকরণের বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি।

গণিতের সব টপিকের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, কোনো টপিক বাদ দিইনি। শর্টকাটে অঙ্ক করার ফর্মুলাগুলোও দখলে রাখতাম। পুরনো সিলেবাসের নবম-দশম শ্রেণির বইটির অঙ্কগুলোও চর্চা করেছি। জ্যামিতির জন্য নবম-দশম শ্রেণির বই পড়েছি। ইংরেজি সাহিত্যের ওপরও পড়াশোনা করতাম। ইংরেজি গ্রামারের জন্য বিভিন্ন টপিক; যেমন—Parts of speech, Voice change, Phrase, Idioms, Vocabulary, Synonym and Antonym বিভিন্ন বই থেকে পড়েছি। ইংরেজি রচনা, সামারি, রিপোর্ট ও লেটার নোট করে পড়েছি। দৈনন্দিন বিজ্ঞানের জন্য নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বইটি পড়েছি।

 

সাধারণ জ্ঞান, আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ বিষয়াবলির জন্য ‘আজকের বিশ্ব’ বইটি পড়েছি। বিগত সালের প্রশ্ন যাচাই-বাছাই করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো দাগিয়ে নিয়েছিলাম। পরে শুধু দাগানো অংশটুকুই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। আন্তর্জাতিক বিষয়ের জন্য পুরো বিশ্বের ম্যাপ মাথায় ছিল। রিটেনের জন্য টপিক ধরে নোট করে রাখতাম। সংবিধান প্রায় মুখস্থ ছিল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য বিভিন্ন পত্রিকার কলামে নিয়মিত চোখ রাখতাম। পত্রিকায় প্রকাশিত যেসব খবর ও তথ্য পরীক্ষার জন্য উপযোগী, শুধু সেগুলোই পড়তাম। 

 

আমি সময়টাকে কাজে লাগিয়েছি, কোনো সময় অপচয় হতে দিইনি। খাওয়াদাওয়া, ঘুম আর তিন ঘণ্টা টিউশনির সময় বাদ দিয়ে সব সময়ই বই নিয়ে পড়ে থাকতাম। ২০১২ সালের শেষের দিকে অনার্স শেষ হয়। অনার্স সার্টিফিকেট পাওয়ার পর প্রথম চাকরির আবেদন করার সুযোগ পাই এক্সিম ব্যাংকে অফিসার্স ক্যাশে। প্রথম চাকরির পরীক্ষায়ই রিটেনে টিকেছিলাম। ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা আমাকে বললেন, ‘তুমি তো মাস্টার্স করোনি, যাও মাস্টার্স করে এসো।’

দ্বিতীয় চাকরির পরীক্ষা দিলাম অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ফিন্যান্স) পদে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছিল ১০০ নম্বরের এমসিকিউ। এর মধ্যে ৬০ নম্বর ছিল সাবজেকটিভ (হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা)। বাকি ৪০ নম্বর ছিল জেনারেল (বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান)। জেনারেল ৪০টার মধ্যে ৪০টাই ঠিক হয়েছে। প্রিলিমিনারিতে টিকে গেলাম। রিটেন পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল ৭৫ নম্বরের। এখানেও সাবজেকটিভ ও জেনারেলের ওপর প্রশ্ন আসে। ফিন্যান্স ও হিসাব হিসাববিজ্ঞানের ওপর টীকা ছিল ২৫ নম্বরের মতো। হিসাববিজ্ঞানের দুইটা অংক ছিল ১০ নম্বরের।  রিটেনেও টিকে গেলাম। দুই দিন পর ভাইভা দিলাম।

 

ভাইভা বোর্ডে প্রশ্নকর্তা ছিল মোট চারজন। প্রথমে একজন প্রশ্নকর্তা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলেন। এরপর তিনিই আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি হিন্দি সিনেমা কয়টা, কী দিখেছ?’ আমি বললাম, ‘হিন্দি সিনেমা আমি দেখি না।’ স্যার বললেন, ‘কেন?’ বললাম, ‘স্যার, আমার তো দেশীয় সিনেমা আছে, হিন্দি সিনেমা দেখব কেন? ওটা তো আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়।’ পরে আরেকজন প্রশ্নকর্তা ধানসিঁড়ির ওপর কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলেন। ধানসিঁড়ি কী? এই নামে কোনো কিছু আছে কি না? এর লোকেশন কোথায়? ধানসিঁড়ি কবিতাটি কে লিখেছেন?—এসব। এরপর বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন করেন, প্রায় সব কটির উত্তরই আমি পেরেছি। পরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ফিন্যান্স) হিসেবে আমার চাকরি হয়ে গেল। এক সপ্তাহের মধ্যেই নিয়োগের সব প্রক্রিয়া শেষ করে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল। এর আগে প্রথমবারের মতো ৩৩তম বিসিএসে আবেদন করেছিলাম অনার্স এপিয়ার্ড দিয়ে। ওটার ভাইভা দিয়েছি ২০১৩ সালে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে চাকরি হওয়ার পর। ৩৩তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে আমি শিক্ষা ক্যাডার পেয়েছিলাম; কিন্তু আমার শিক্ষকতা ভালো না লাগায় ওদিকে আর যাইনি। আমি মাস্টার্স করেছি চাকরিরত অবস্থায়। মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। রেজাল্টে দেখা গেল আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে নবম স্থান অধিকার করেছি।

 

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে যোগদানের আগে আরো কয়েক জায়গায় রিটেন পরীক্ষা দেওয়া ছিল, রিটেনে টিকেছিও; কিন্তু ভাইভা দিইনি চাকরি হওয়ার ভয়ে। কারণ নিশ্চিত ছিলাম ভাইভা দিলেই চাকরি হবে।

অনুলিখন : আব্দুর রাজ্জাক

ছবি : কাকলী প্রধান

মন্তব্য