kalerkantho

ভারতীয় পাইলটের মুক্তি শান্তি কি ফিরছে?

তামান্না মিনহাজ   

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উপমহাদেশ সম্ভবত আরেকটি বড় সংঘাত থেকে মুক্তি পেল। প্রায় বেধে যাওয়া একটি যুদ্ধের কিনারা থেকে ফিরে এলো ভারত-পাকিস্তান—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলার সময় এখনো না হলেও সংকটের প্রাথমিক তীব্রতা তারা কাটিয়ে উঠেছে—এটুকু বলাই যায়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালানোর পর থেকে মুখোমুখি সমরের যে তীব্র আশঙ্কা দানা বেঁধে উঠেছিল, তা আর নেই বললেই চলে। ১৯৭১ সালের পর থেকে এই প্রথম পাকিস্তানে বিমান হামলা চালাল ভারত। জবাবে একই কাজ করেছে পাকিস্তানও। তবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাইলট অভিনন্দন বর্তমানের পাকিস্তানের হাতে আটক আর মুক্তির ঘটনায় পরিস্থিতি অনেকটাই সহনীয় হয়ে এসেছে।

 

এবারের সংকট

এবারের সংকটের সূত্রপাত ১৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সেসের (সিআরপিএফ) গাড়ির বহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জওয়ান নিহত হন। আগের যেকোনো বারের তুলনায় এবারের হামলার ভয়াবহতা অনেক বেশি ছিল। হামলার দায় স্বীকার করে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ। এর পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। ভারত প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। পরে সেই কাজটিই করে ভারত। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঢুকে বালাকোটে বোমা ফেলে আসে ভারতের যুদ্ধবিমান মিরাজ-২০০০। ভারতের দাবি, জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে অন্তত তিন শতাধিক সদস্যকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান অবশ্য জানায়, ভারতের বোমারু বিমান তাদের আকাশসীমা অতিক্রম করে বালাকোটের বিরানভূমিতে বোমা ফেলে গেছে। সেখানে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

 

পাইলট আটক

এর পরও সংকট অব্যাহত থাকে কয়েক দিন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের জঙ্গি বিমান আবারও পাকিস্তানের আকাশসীমা অতিক্রম করে। পাকিস্তানও এদিন ভারতশাসিত কাশ্মীরে তাদের যুদ্ধবিমান পাঠায়। একটি বিমান বিধ্বস্ত হয় তাদের। ভারতের দুটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে একটি বিমানের পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। এর এক দিনের মাথায়ই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জানান, শান্তির বার্তা হিসেবে পাকিস্তান অভিনন্দনকে মুক্তি দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেবে। ১ মার্চ রাতে ইমরান খান তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। ভারতে ফিরে যান অভিনন্দন।

অভিনন্দন দেশে ফিরে যাওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে উত্তেজনা কমে শান্তি ফিরবে—এমন আশা করা যেতেই পারে। তবে রাতারাতি পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, এতটা আশা করা হয়তো ঠিক নয়। এবং তা হয়ওনি। দুই পক্ষেরই আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে বড় পর্যায়ের যে উত্তেজনা এ অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল, তার আকার-প্রকারের তীব্রতা কমেছে।

 

আঞ্চলিক রাজনীতি

ভারতে লোকসভা নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতায় বিজেপি। যে স্বপ্ন দেখিয়ে গত নির্বাচনে তারা ভূমিধস বিজয় অর্জন করে, তা বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি ভারত। ধনী-গরিব ব্যবধান বেড়েছে, কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে, বেড়েছে বেকারত্বের হারও। একই সঙ্গে বেড়েছে সাম্প্রদায়িকতা। যার কোনোটিই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষে ইতিবাচক নয়। এমনই একটি সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে এ ধরনের উত্তেজনা এবং বিমান পাঠিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভেতরের জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে আসা তার দলের (ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি) ফুটা হয়ে যাওয়া পালে হাওয়া দেবে। এ ঘটনার ফায়দা শুধু যে বিজেপির পকেটেই যাবে তা না, সুবিধা পাবেন ইমরান খানও। অনভিজ্ঞ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জনগণের কাছে আস্থার জায়গাটা বিনির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দিয়ে, বারবার শান্তি আলোচনার ডাক দিয়ে সেই আস্থা অনেকটাই জয় করে নিয়েছেন ইমরান।

 

কাশ্মীর সংকট

১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় ভারত ও পাকিস্তান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজের সিদ্ধান্তে হিমালয় কোলের এই অংশটি পড়ে ভারতে। সেই থেকেই সংকটের সূচনা, যা চলছে আজ পর্যন্ত। দুই দেশ ভূস্বর্গ বলে পরিচিত এই অংশটি নিয়ে এ পর্যন্ত দুই দফা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। আর সংঘাতে জড়িয়েছে কতবার, তার কোনো হিসাব নেই। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কাশ্মীরের লড়াইয়ে কত প্রাণ আর রক্ত ঝরেছে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ বাধে ১৯৬৫ সালে। সে দফায় কাশ্মীরের একটি অংশ দখল করে নেয় পাকিস্তান। ওই অংশটিই এখন আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। এখানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ সেনা অবস্থান করছে। বিশ্বে একক স্থান হিসেবে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অবস্থানকারী সেনাসংখ্যাই সর্বাধিক।

মন্তব্য