kalerkantho

সৌদি যুবরাজ এশিয়ায়

তামান্না মিনহাজ

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সৌদি যুবরাজ এশিয়ায়

সৌদি যুবরাজ সালমানের (ডানে) সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

হাজার কোটি ডলারের চুক্তি আর ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার—এই দুইয়ের মিশেল ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক সময়ের এশিয়া সফর। আঞ্চলিক আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানামুখী টানাপড়েনের মধ্যে যুবরাজের এ সফর বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে, আলোচনায় এসেছে। 

 

যুবরাজের সংকট

যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা সাংবাদিক জামাল খাশোগি গত অক্টোবর (২০১৮) মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে খুন হন। এই সাংবাদিক যুবরাজ সালমানের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। যুবরাজের নির্দেশেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে প্রচারমাধ্যমে আসে। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব প্রতিবেদনেও এমন ইঙ্গিত করা হয়। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে অনেকটাই অচ্ছুত হয়ে ওঠেন যুবরাজ। মাঝে একটি জি২০ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেননি। এমনই এক অবস্থায় প্রথমবারের মতো এশিয়া সফরে বের হন যুবরাজ। এই সফরের উদ্দেশ্য যতটা বাণিজ্যিক, তার চেয়েও অনেক বেশি ভাবমূর্তি উদ্ধার। এ দফায় পাকিস্তান, ভারত ও চীন সফর করেন তিনি। এই সফরে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নামও যুক্ত ছিল। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে অজ্ঞাত কারণে তালিকা থেকে এ দুটি দেশের নাম বাদ পড়ে। পাকিস্তান থেকে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু কাশ্মীর পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তা ‘ভালো করে বুঝতে’ এক দিনের জন্য দেশে ফিরে যান তিনি। পরে আবার সৌদি আরব থেকে ভারতে যান। তবে কী বুঝলেন বা মাঝের ওই এক দিনে ঠিক কী ঘটল—এ সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

 

দুই হাজার কোটি ডলারের চুক্তি

যে উদ্দেশ্য নিয়ে যুবরাজ এই সফর শুরু করেন, তার প্রায় পুরোটাই সফল হয়েছে বলা চলে। আর বিষয়টি একপক্ষীয়ও নয়। দুই পক্ষেরই স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সফরের মধ্য দিয়ে যুবরাজের এই যাত্রা শুরু হয়। বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয় সৌদি যুবরাজকে। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিশান-ই-পাকিস্তান প্রদান করা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজে গাড়ি চালিয়ে যুবরাজকে বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে (সফরকালে এখানেই অবস্থান করেন যুবরাজ) নিয়ে যান। পাকিস্তানকেও অবশ্য হতাশ করেননি যুবরাজ। পাকিস্তানের জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব। নগদ অর্থের তীব্র সংকটে থাকা পাকিস্তান এসব চুক্তির কারণে তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে মাত্র ৮০০ কোটি ডলার। গত শতাব্দীর আশির দশকের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে মোট ১৩ বার বেইল আউট সহায়তা নিয়েছে ইসলামাবাদ। সৌদি আরবের কাছ থেকেও তারা এরই মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার সহায়তা গ্রহণ করেছে।

শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও পাকিস্তানকে সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

 

ভারত সফরে সৌদি যুবরাজ

ভারতেও বিপুল সংবর্ধনা পান সৌদি যুবরাজ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে গিয়ে সৌদি যুবরাজকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। মূলত মোদির চাপে পড়েই ভারতে গিয়ে যুবরাজের আচরণে কিছুটা পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। তিনি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করলেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারতের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও রাজি হন তিনি। তাঁর এই সফর মাত্র ৩৬ ঘণ্টার হলেও এর মধ্যেই কয়েক শত কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারক সই হয় দুই দেশের মধ্যে। ভারতের আমদানীকৃত অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ আসে সৌদি থেকে।

 

সব শেষে চীন  

এশিয়া সফরের শেষ পর্যায়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি চীনে পৌঁছেছেন সৌদি যুবরাজ। সেখানেও তাঁর সংবর্ধনায় কোনো ঘাটতি ছিল না। চীন সৌদি আরবের সর্ববৃহত্ বাণিজ্য অংশীদার। গত বছর তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৩৩০ কোটি ডলার। এর আগের বছর সৌদি বাদশাহ সালমান চীন সফর করেন, সে সময় দুই দেশের মধ্যে সাড়ে ছয় হাজার কোটি ডলারের চুক্তি হয়। এগুলো ছিল মূলত জ্বালানি ও প্রযুক্তিবিষয়ক চুক্তি। এবার এক হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছেন যুবরাজ। সৌদি যুবরাজ দেখাতে চান, পশ্চিমা দেশগুলোকে বাদ দিয়েও তাঁর হাতে বাণিজ্যের অন্য সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নিজের অবস্থানটিও সুসংহত করলেন তিনি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এশিয়ায় এখনো যুবরাজের মিত্র রয়েছে—পশ্চিমাদের এমন বার্তা দিতেই এত সাড়ম্বরে সফরে বের হয়েছেন এমবিএস। সিঙ্গাপুরের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস এম ডোরসে বলেন, ‘তিনি দেখাতে চান যে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে জাতিচ্যুত হয়ে যাননি।’ তিনি প্রমাণ করতে চান যে তাঁর এখনো ‘আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বাদশাহর পর সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি।’

মন্তব্য