kalerkantho


মেয়ে হয়ে কিভাবে ব্যাংকে চাকরি করবেন?

চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার। অম্লমধুর এক অভিজ্ঞতা। রায়হান রহমানকে ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র অফিসার তৃষিতা আহমেদ বহ্নী

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মেয়ে হয়ে কিভাবে ব্যাংকে চাকরি করবেন?

কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে নিজেকে খাপ খাওয়াতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে বেশ চ্যালেঞ্জের ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তত দিনে ছোটবেলার মুখস্থ স্বপ্ন ‘ডাক্তার হব’ ধরনের ইচ্ছা বাদ! বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে দেখতাম, বড় আপুরা বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন ভাবলাম, আমিও বিসিএস দেব। তাই একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে নিজেকে সব সময় আপডেট রাখার চেষ্টা করতাম। অনার্স ও মাস্টার্স শেষে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করি। তিনটি প্রতিষ্ঠানে ভাইভা দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার।

প্রথম ভাইভা দিয়েছিলাম ৩০তম বিসিএসে। জীবনের প্রথম ভাইভা বলে কথা! আগের রাতে ঘুমই হয়নি। ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করেও কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। প্রথমেই আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন। বলতে বলেছিলেন নিজের সম্পর্কে। তারপর অনার্সের পড়ার বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন, পরিসংখ্যানবিদ্যা বিষয়টি কী? উত্তর দিয়েছিলাম, পরিসংখ্যান হচ্ছে এক ধরনের গাণিতিক বিজ্ঞান। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে গাণিতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার একটি প্রক্রিয়াকে পরিসংখ্যানবিদ্যা বলা হয়। উত্তর শুনে তাঁরা খুব বেশি খুশি হয়েছিলেন বলে আমার মনে হয়নি। পরে নিজ জেলা শহর সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করে দিয়েছিলাম। যদিও ভাইভায় আমি টিকিনি। প্রথম ভাইভা দেওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। পরের ভাইভাগুলোতে আর নার্ভাস হইনি।

দ্বিতীয়বার ভাইভা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম বাংলাদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে সহকারী পরিচালক পদে। ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করতেই আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোথায় পড়াশোনা করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলার পর প্রশ্ন করেছিলেন, ডাকসু সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন? বলেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে সংক্ষেপে ডাকসু ডাকা হয়। এটি ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডাকসুর উদ্যোগেই ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। আমার তথ্যভিত্তিক উত্তরটি শুনে তাঁরা খুশি হয়েছিলেন। তারপর অনার্সের সাবজেক্ট পরিসংখ্যান নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তা? পরিসংখ্যান না থাকলে কোন বিষয়গুলো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ত? পরিসংখ্যানের উৎপত্তি সম্পর্কে কী জানেন? সব শেষে মুক্তিযুদ্ধ ও আমার নিজ জেলা শহর নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন কুড়িগ্রামের প্রখ্যাত মানুষের নাম। ব্যাটে-বলে হয়নি বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে যোগ দেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ ভাইভা দিয়েছি রূপালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার পদে। বেশ লম্বা সময় ভাইভা বোর্ডে রাখা হয়েছিল। প্রথমেই একটি প্রশ্ন করে আমাকে বিব্রত করেছিলেন। বলেছিলেন, মেয়ে হয়ে কিভাবে ব্যাংকে চাকরি করবেন? উত্তর দিয়েছিলাম, কর্মক্ষমতার বিচারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা একেবারেই পিছিয়ে নেই। আমি আমার মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে চাকরি করব। একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ চালাচ্ছেন, আমিও ব্যাংকে চাকরি করতে পারব। আমার উত্তরটি শুনে তাঁরা খুবই খুশি হয়েছিলেন। পরে ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। এটিএম কার্ড কী, ব্যাংকে সাধারণত কী কী কাজ হয়ে থাকে, আধুনিক ব্যাংকের ধারণা প্রথম কোথায় পাওয়া যায়, ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের মৌলিক পার্থক্য কী? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে পেরেছিলাম বলেই চাকরিটি হয়েছিল। ২০১৪ সাল থেকে এখানেই কাজ করছি। ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করে সত্যি ভালো লাগছে।

নতুনদের উদ্দেশে বলতে চাই—অনেকের ধারণা, ভাইভা বোর্ডে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে বিব্রত করে দেওয়া হয় সবাইকে। এ তথ্য সঠিক বলে আমার মনে হয়নি। প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন বুঝে তারপর উত্তর দিতে হবে। তর্কে জড়ানো যাবে না। সঠিক তথ্য দিতে হবে। উত্তর জানা না থাকলে সরাসরি বলতে হবে, আমার এ বিষয়ে জানা নেই।



মন্তব্য