kalerkantho


বিতর্কিত নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় মাদুরো

আরাফাত শাহরিয়ার   

৩০ মে, ২০১৮ ০০:০০



বিতর্কিত নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় মাদুরো

নির্বাচন বয়কট করে প্রধান বিরোধী দল, অংশ নেওয়া দলগুলো তুলে ভোট কারচুপির অভিযোগ। ভোট গণনার আগেই প্রত্যাখ্যাত হয় ফল। এরকম নানা বিতর্ক ছড়িয়ে সম্প্রতি শেষ হলো ভেনিজুয়েলার নির্বাচন। যথারীতি আবারও ছয় বছরের জন্য ক্ষমতায় এলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ৫৫ বছর বয়সী সমাজতান্ত্রিক এই নেতা নিজের বিজয়কে আখ্যা দিয়েছেন ‘সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জয়’ বলে। তবে মাদুরোকে পড়তে হয়েছে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে। নির্বাচনের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। বিতর্ক তৈরি হয়েছে লাতিন আমেরিকায়ও।

 

নির্বাচনের ফল

ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিকোলাস মাদুরোকে জয়ী ঘোষণা করেছে দেশটির ন্যাশনাল ইলেকটোরাল কাউন্সিল (সিএনই)। সরকারি ফলাফলে মাদুরো পেয়েছেন ৬৭.৭ শতাংশ ভোট। ২১.২ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে হেনরি ফ্যালকন। সিএনই বলছে, ভোটদানের হার ৪৬ শতাংশ; যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোট পড়েছে ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী মাদুরোর পক্ষে। বিরোধীদের দাবি, ভোটদানের হার ছিল তার চেয়েও কম, ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ভোটের দিন সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন নিহত হন। ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছেন বিরোধী প্রার্থীরা।

 

বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদ

ভেনিজুয়েলার বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতিবাদ হিসেবে ১৪টি দেশ সেখান থেকে তাদের কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলি, পানামা, পেরুও রয়েছে। দেশটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেনিজুয়েলার সরকার ও রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানিতে নতুন করে কোনো অর্থ সরবরাহ করতে পারবে না। চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা ভোটের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার নির্বাচন সত্যিকারের গণতন্ত্রের ন্যূনতম মান বজায় রাখেনি।’ পানামার সরকারও এই ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ভোটের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বেশ কয়েকটি লাতিন দেশ জানিয়েছিল, এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না তারা। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলি, পানামা ও পেরু কারাকাসের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। তবে মাদুরোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত আছে চীন, রাশিয়া, এল সালভাদর ও কিউবার মতো মিত্রদেশগুলোর। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দনও জানিয়েছে তারা।

 

বাস ড্রাইভার থেকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে

ভেনিজুয়েলার প্রয়াত বামপন্থী নেতা হুগো শ্যাভেজের উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হওয়া, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পেছনে আছে অসাধারণ এক গল্প। মাদুরো একসময় বাস ড্রাইভার হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করলেও নিজ যোগ্যতাবলেই শ্যাভেজের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভের পর শ্যাভেজ তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর শ্যাভেজ তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করেন। ১৯৯২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের অভিযোগে শ্যাভেজ যখন কারাগারে, তখন এই মাদুরোই তাঁকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মূলত এর পর থেকেই শ্যাভেজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যান আরেক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী মাদুরো। জীবদ্দশায় শ্যাভেজকে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করতেন। মাদুরো মনে করেন, শ্যাভেজই তাঁর জীবনের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়ে তাঁকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একজন যোগ্য সেনানী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

 

শ্যাভেজের উত্তরাধিকার

ভেনিজুয়েলার ক্যারিসমেটিক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ মৃত্যুর আগে উত্তরসূরি করে যান নিকোলাস মাদুরোকে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে মাদুরো জেতেন মাত্র দুই লাখ ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। মাদুরোর পথ খুব সহজ ছিল না। দেশে ছিল সব কিছুর অভাব, এমনকি খাদ্যেরও অনটন। বলা হয়, শ্যাভেজের শাসনকালে ভেনিজুয়েলার অধিবাসীরা চরম দারিদ্র্য থেকে পরিত্রাণ পায়। কিন্তু তিনি ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে যে অবস্থায় রেখে যান, তাকে আশাজনক বলা চলে না। মুদ্রাস্ফীতি, মান্ধাতার আমলের শিল্প-কারখানা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করাটাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে; এসবই শ্যাভেজের উত্তরাধিকার। শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার তেলনির্ভর অর্থনীতিকে আরো তেলনির্ভরতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন, অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটানোর কোনো চেষ্টা করেননি। দৈনন্দিন ঘাটতি এবং অনটন; ময়দা, মাংস, চিনি, তেল, এমনকি ওষুধপত্র সব কিছুর আকাল। এমন অবস্থায় মাদুরো অর্থনীতিকেই জোরদার করবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল জনগণের। জনগণের প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হন মাদুরো।

 

নানা সংকট

ভেনিজুয়েলার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ নাজুক। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখন কয়েক শ শতাংশ ছাড়িয়েছে, এমনকি খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া যোগাযোগ ও বিদ্যুত্ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে লুটপাটের মতো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ছে। অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এসব মোকাবেলায় ব্যর্থ হওয়ায় একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে মাদুরোর জনপ্রিয়তা। তবে বরাবরই এ সংকটকে সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত বলে দাবি করে আসছে ভেনিজুয়েলা সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের ভোট পাবেন না, এই শঙ্কা থেকেই এমন বিতর্কিত নির্বাচনের আশ্রয় নিলেন মাদুরো।



মন্তব্য