kalerkantho


ভারতে বিধানসভা নির্বাচন

লাল দুর্গের পতন

তামান্না মিনহাজ   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লাল দুর্গের পতন

ভারতের ত্রিপুরাকে বলা হতো ‘লাল দুর্গ’। রাজ্যটি টানা ২৫ বছর ছিল বামদের দখলে। লাল সরকারের শাসনে অভ্যস্ততা ছিল জনগণের। সাদামাটা জীবন যাপন করা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়েও কারো কোনো প্রশ্ন ছিল না। সিপিএমের টানা ২৫ বছরের শাসনের মধ্যে ২০ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পাঁচ বছর আগের বিধানসভা এবং তিন বছর আগের লোকসভা ভোটেও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ত্রিপুরা ঝুলিতে উল্লেখ করার মতো ভোট ছিল না। মানিক সরকারকে হারানো নরেন্দ্র মোদির দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ত্রিপুরায় এবারের বিধানসভা নির্বাচন হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। ফল ঘোষণা হয় ৩ মার্চ। তাতে লাল সরকার উড়ে গেল বিজেপির গেরুয়া ঝড়ে। ত্রিপুরার সাফল্যে উচ্ছ্বসিত বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ মন্তব্য করেছেন, ‘লেফট ইজ নট রাইট ইন ইন্ডিয়া!’

 

‘চলো পাল্টাই’

‘চলো পাল্টাই’ স্লোগানে ত্রিপুরায় পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিল বিজেপি। লাল দুর্গে জোর ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা হবে, সেটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সে ধাক্কায় বামরা এভাবে ধূলিসাৎ হবে, এমনটা ভাবতে পারেননি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও। ত্রিপুরার স্থগিত একটি আসন ছাড়া বাকি ৫৯টি আসনের মধ্যে ৪৩টিতে জয় পেয়েছে বিজেপি। একসময়ের প্রতিপত্তিশালী সিপিএম পেয়েছে মাত্র ১৬টি আসন। সিপিএম ৪৯টি আসন পেয়েছিল গত নির্বাচনে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ১০টি আসন পেলেও এবার কোনো আসন পায়নি।

 

বিজেপির জয়ের কারণ

উপজাতিদের দল ইনডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিএফটি) সঙ্গে জোট গড়ে বিজেপি। এর মধ্য দিয়ে রাজ্যটির আদিবাসী সম্প্র্রদায়গুলোর কাছে পৌঁছে যায় বিজেপি, যারা জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ। বিজেপির এই জোট একটি সফল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আদিবাসী এলাকাগুলোতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। পাশাপাশি স্বশাসিত রাজ্য পরিষদ করে এর মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে সরাসরি তহবিল ছাড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া রাজ্যে বেকারত্বসহ নানা সমস্যা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ বামপন্থী সরকার। সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। অন্য দল ভেঙে চৌকস নেতাদের নিজ দলে টানা, তাঁদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়েছে তারা।

 

বিজেপির তৎপরতা না বিতৃষ্ণা?

ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট প্রথম ক্ষমতায় আসে ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৩ সালের নির্বাচনেও জয় পায় দলটি। মাঝে ১৯৮৮ সালের ভোটে জয় পায়নি তারা। তবে ১৯৯৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটানা চারবার জয় পায় তারা। সেই লাল দুর্গের পতন হলো এবারের বিধানসভা নির্বাচনে। ত্রিপুরা রাজ্য হারানোর পর পুরো ভারতে বামপন্থীদের দখলে এখন একটিমাত্র রাজ্য অবশিষ্ট আছে। তা হচ্ছে কেরালা। ত্রিপুরায় গেরুয়া ঝাণ্ডা ওড়াতে বিজেপি সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা তৈরি না হলে শুধু বিজেপির তৎপরতায় কি এতটা সম্ভব?

প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত ত্রিপুরার বামপন্থী নেতাদের। অনুন্নয়ন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারাসহ আরো অনেক কিছুই হতে পারে এই প্রত্যাখ্যানের কারণ। কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে বামফ্রন্টকেই।

 

সংকটে কংগ্রেসও

আগের নির্বাচনে ত্রিপুরার মানুষ প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিল কংগ্রেসকে। সেই কংগ্রেস এবার বিধানসভায় কোনো আসনই পায়নি। নাগাল্যান্ডেও ঠিক একই ছবি। একটি আসনও পায়নি কংগ্রেস।

মেঘালয় এত দিন কংগ্রেসের শাসনে ছিল। এবারও সে রাজ্যে কংগ্রেসই বৃহত্তম দল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটা দূরেই থেমে গেছে দলটি। কোন প্রেক্ষাপটে এই বিপর্যয়ের মুখে পড়ল কংগ্রেস? গুজরাট, পাঞ্জাব, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে একের পর এক নির্বাচন বা উপনির্বাচনে বিজেপিকে ধাক্কা দিয়েছে কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পুরনো দলটি এমন চর্চা যখন শুরু হচ্ছে, ঠিক তখনই উত্তর-পূর্ব ভারতের দুই রাজ্যে কংগ্রেস এ রকম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল কিভাবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, অবিলম্বে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত কংগ্রেসের।

 

বিজেপির উত্থান

ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২০টিতে ক্ষমতায় বিজেপি। বিজেপির এই অগ্রযাত্রা ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ওই অঞ্চলের সাতটি রাজ্যের মধ্যে আসাম, মণিপুর ও অরুণাচলে এরই মধ্যে বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ত্রিপুরায় জয় পেয়েছে, নাগাল্যান্ডেও ক্ষমতার দাবিদার হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি জোট। তবে একই সঙ্গে দায়িত্বও অনেকটা বেড়ে গেল বিজেপির। দীর্ঘদিন ধরে যেসব দলকে ভোট দিতে অভ্যস্ত উত্তর-পূর্বের মানুষ, তাদের দিক থেকে মুখ অনেকটাই ফিরিয়ে নিয়ে বিজেপির ওপর ভরসা রেখেছে তারা। এ আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা খুব সহজ কাজ নয়।



মন্তব্য