kalerkantho


দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত পার্ক গিউন হে

কুদরাত-ই-খুদা বাবু   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত পার্ক গিউন হে

দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হলো পার্ক গিউন হেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হেকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির সাংবিধানিক আদালত।

পার্লামেন্টে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হওয়ার পর দীর্ঘ শুনানি শেষে ১০ মার্চ আদালত ওই রায় দেন। আর আদালতের রায় শোনার পর দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে পার্ক গিউন হের বিরোধীরা যেমন উল্লাস প্রকাশ করেছে, তেমনি তাঁর সমর্থকরা রাজধানীজুড়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। এ ঘটনায় চলা বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত প্রাণ গেছে তিনজনের।

 

কে এই পার্ক গিউন হে?

পার্ক গিউন হে দক্ষিণ কোরিয়ার ১১তম প্রেসিডেন্ট। তিনিই দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। তিনিই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশটির প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অভিশংসিত হলেন। ১৯৫২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার জুং জেলার সামডিওক ডংয়ে জন্ম নেওয়া পার্ক গিউন হে ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল ও ২০১১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কনজারভেটিভ গ্র্যান্ড ন্যাশনাল পার্টির (জিএনপি) সভানেত্রী ছিলেন। ছিলেন জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যও। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের র্যাংকিংয়ে বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে তিনি ১১তম ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবে স্থান পান।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের মধ্যে হয়েছিলেন ৪৬তম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত।

 

কেন বরখাস্ত হলেন

পার্কের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তিনি তাঁর বান্ধবী চোই সুন সিলকে নেপথ্যে থেকে দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেন। চোই সুন সিল কোনো সরকারি পদে না থাকলেও ব্যাপক প্রভাবের অধিকারী ছিলেন। চোই সুন সিল ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠার পর পরই এ সংকটের সূচনা হয়। লাখো ক্ষুব্ধ মানুষ পার্ক গিউন হের পদত্যাগের দাবিতে দিনের পর দিন রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ করে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তাঁকে অভিশংসনের পক্ষে রায় দেয়। দুর্নীতি কেলেঙ্কারির জেরে পার্লামেন্টে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হওয়ার পর দীর্ঘ শুনানি শেষে দেশটির সাংবিধানিক আদালত ১০ মার্চ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পার্ক গিউন হেকে বরখাস্ত করেন।

 

রায়ে যা আছে

আটজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সাংবিধানিক আদালত সর্বসম্মতিক্রমে পার্লামেন্টে অনুমোদিত অভিশংসন উদ্যোগের পক্ষে রায় দিয়েছেন। রায়ে আদালত বলেছেন, প্রেসিডেন্ট গিউন হের কর্মকাণ্ড গণতন্ত্রের চেতনা ও আইনের শাসনের গুরুতর ক্ষতি করেছে, তাই তাঁকে বরখাস্ত করা হলো। দেশটির প্রধান বিচারক পার্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এই মর্মে মন্তব্য করেছেন যে ‘তিনি জনগণের আস্থার বরখেলাপ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য এটা সহ্য করা যায় না। ’

 

বিচারের মুখোমুখিও করা যাবে

প্রেসিডেন্ট পদে থাকার ফলে এত দিন বিচার থেকে দায়মুক্তির আওতায় ছিলেন গিউন হে। কিন্তু দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়ের ফলে তিনি এখন আর দায়মুক্তির সুবিধা পাবেন না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে এখন মামলা করা যাবে। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করাসহ তাঁকে বিচারের মুখোমুখিও করা যাবে।

 

প্রেসিডেন্টের অভিশংসন ও বিক্ষোভ

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন হের অভিশংসনের ঘটনায় তাঁর সমর্থকরা সিউলজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। ওই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছে কয়েক শ মানুষ।

সিউলের রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট কিও আন।

 

দুই মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

সর্বোচ্চ আদালত গিউন হের অভিশংসনের পক্ষে রায় দেওয়ায় দুই মাসের মধ্যে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। পার্লামেন্টে গিউন হের অভিশংসনের পক্ষে ভোট পড়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী কিও আন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের ৯ মে দক্ষিণ কোরিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যেই দেশটির নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী দেশটির ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান ও বিরোধী নেতা মুন জে ইন। তিনি যেসব নীতিগত প্রস্তাব দিয়েছেন, তার মধ্যে ‘সানশাইন’ নীতিতে ফেরত যাওয়া অন্যতম, যেটা ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বাম সরকারের প্রিয় নীতি ছিল। এই নীতি ছিল উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের নীতি।

 

গিউন হেকে গ্রেপ্তার করার দাবি

পার্ক গিউন হেকে গ্রেপ্তার করার দাবি দিনে দিনে জোরালো হচ্ছে। বিরোধীদের অনেকেই গিউন হেকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের মুখপাত্র চই ইন শক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁরা গিউন হেকে গ্রেপ্তার করার জোর দাবি জানাচ্ছেন।

 

উত্তর কোরিয়ার ভাবভঙ্গি

দক্ষিণ কোরিয়ার এই টালমাটাল অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার ভাবভঙ্গি অবশ্য অলক্ষুণে মনে হচ্ছে। কারণ এর মধ্যেই তারা চারটি মধ্যম সারির ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উেক্ষপণ করেছে। উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য অনুসারে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জাপানের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে সক্ষম।

 

বিশ্লেষকরা বলেন

অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, যে দেশের গণতন্ত্রের বয়স সবে ৩০ বছর, সেই দেশের আদালত যে ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবাধ্যতা’ দেখালেন, তা সত্যিই অসামান্য। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুলের অধ্যাপক সুং ইয়ুন লি বলেছেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার নবীন ইতিহাসে এটা এক বড় ঘটনা। এই কেলেঙ্কারিতে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। এটা মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছে, বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান মানুষও আইনের ঊর্ধ্বে নন। ’


মন্তব্য