kalerkantho


দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন সামরিক মহড়া

কুদরাত-ই-খুদা বাবু   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন সামরিক মহড়া

দিক্ষিণ চীন সাগর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই দুই শক্তিধর দেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

ট্রাম্প যুগে দুই শক্তিধর দেশের সম্পর্ক কেমন হবে, সেই নিয়েই সরগরম বিশ্বরাজনীতি। আর এর মধ্যেই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন এয়ারক্রাফট কেরিয়ার ইউএসএস কার্ল ভিনসনের মহড়া নিয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়েছে। শুধু ইউএসএস কার্ল ভিনসন নয়, আরো বেশ কয়েকটি মার্কিন রণতরীও এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে। আর এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেজায় চটেছে চীন।

 

দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত মহড়ায় মার্কিন রণতরী

দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী টহল দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ১৮ ফেব্রুয়ারি এ খবর জানিয়েছে। এর এক দিন আগে চীন তাদের সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। মার্কিন নৌবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, ইউএসএস কার্ল ভিনসন নামের রণতরীর একটি বহর দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। এসব যুদ্ধজাহাজ ও বিমান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়াম এলাকায় সম্প্রতি মহড়া দিয়েছে।

 

মহড়া নিয়ে উত্তেজনা ও আশঙ্কা

দক্ষিণ চীন সাগরে যাতে চীনের সার্বভৌমত্ব নষ্ট না হয়, সে জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। তবে এ হুঁশিয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র কর্ণপাত করেনি। ১৭ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের মহড়া শেষ করে চীন। তার পাল্টা জবাব দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই মহড়া বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ ও তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হৃদ্যতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেজায় চটে চীন। ভারতের সঙ্গে জাপানের যৌথ সামরিক অভিযানও মেনে নিতে পারেনি দেশটি। রুশ সীমান্তেও একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে তারা।

রুশ মিডিয়ার দাবি, ওই ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সে ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরে অভূতপূর্ব সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এই যুদ্ধ অতীতের দুটি বিশ্বযুদ্ধকে বহু গুণে ছাপিয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মার্কিন নৌবাহিনীর বক্তব্য

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলোকে দক্ষিণ চীন সাগরে অবাধে মহড়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, রণতরী ও যুদ্ধবিমানগুলো অবাধে চলাফেরা করেছে। আর এতেই চীন ক্ষুব্ধ হয়েছে। এদিকে মার্কিন নৌবাহিনী  জানিয়েছে, ভিনসন তার ৩৫ বছরের ইতিহাসে ১৬ বার দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিয়েছে। সামর্থ্যের প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইন্দো-এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সুসম্পর্ককে আরো জোরদার করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা এলাকায় এটি প্রবেশ করেনি বলেও দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

চীনের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি

চলতি বছরের শুরু থেকেই দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়া বাড়ায় চীন। আর সেই মহড়ায় যোগ হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির জাহাজ। আর এই মহড়া অব্যাহত রাখতে বৈশ্বিক কোনো চাপ বা উসকানিকে মূল্য দেবে না দেশটি—সম্প্রতি এমন ঘোষণা দেয় চীন। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একাধিপত্য কায়েম করার চেষ্টার বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবে হুঁশিয়ারি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ চীন সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অধিকার রক্ষা করবে আমেরিকা। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের আচরণ কী হতে পারে জানার চেষ্টা করছে এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ চীন। ট্রাম্প যুগে প্রবেশের পর চীন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেমন মনোভাব হবে—তা-ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশটি।

 

উত্তপ্ত পরিস্থিতি আগে থেকেই

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি অনেকদিন ধরেই। চীনের দাবি, পুরো এলাকাটি তাদের। আর এতেই আপত্তি ব্রুনাই, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের। তারা জানিয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদেরও অধিকার রয়েছে। এলাকাটিতে নিজেদের শক্তি বাড়াতে কৃত্রিম দ্বীপও তৈরি করেছে চীন।

 

অনেকের ধারণা, এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে সামরিক স্থাপনা তৈরি করছে দেশটি। শুধু আশপাশের দেশগুলো নয়, আমেরিকাও চীনের এই পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু সেই আপত্তি উপেক্ষা করেই দক্ষিণ চীন সাগরে প্রতিনিয়ত নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধপূর্ণ দ্বীপগুলোতে চীনের দখল অবশ্যই ঠেকাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র শেন স্পাইসার বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সম্পত্তি নয়। ফলে এটি রক্ষা করার জন্য সব রকমের চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

 

দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব

দক্ষিণ চীন সাগর প্রশান্ত মহাসাগরের অংশ। প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সাগরের চারপাশে রয়েছে চীন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের জলসীমার বিরোধও এই সাগরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ পণ্যবাহী জাহাজ এই সাগর দিয়ে চলাচল করে বলে ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে এই সাগর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ চীন সাগরে যেমন প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রচুর খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস।

 

দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অন্তরালে

অবস্থানগত কারণেই দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্ব বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়ার সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি এ সাগর পথেই হয়ে থাকে। প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থের বাণিজ্য যে পথে হয়ে থাকে, সেখানে সামান্যতম বিরোধ বা উত্তেজনায় সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করাটাই স্বাভাবিক।

দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের প্রশ্নে বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে। বিরোধের মূল কারণ, দক্ষিণ চীন সাগরের ৮০ শতাংশের ওপর চীন তার সার্বভৌমত্ব দাবি করছে, যা উপকূলবর্তী অন্য দেশগুলোর জন্য উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


মন্তব্য