kalerkantho


উত্তর কোরিয়ার ‘সফল’ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা

কুদরাত-ই-খুদা বাবু   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উত্তর কোরিয়ার ‘সফল’ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা

সমাজতান্ত্রিক দেশ উত্তর কোরিয়া সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর উত্তর কোরিয়া প্রথমবারের মতো এই পরীক্ষা চালাল।

উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র-সামর্থ্য বৃদ্ধির ব্যাপারে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণসহ নতুন মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের লক্ষ্যেই এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে বলে বিশ্বনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। উত্তর কোরিয়ার এ ধরনের পদক্ষেপকে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করা হচ্ছে। তাদের বারবার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্যে একদিকে যেমন আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে, অপর দিকে উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

 

যেভাবে পরীক্ষা চালায়

উত্তর কোরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় নর্থ পিয়ঙ্গান প্রদেশের বাঙ্গিয়ন বিমান ঘাঁটি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রবিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে জাপান সাগরের দিকে (পূর্ব সাগর) cyKàKms-2 নামক ক্ষেপণাস্ত্রটি ছুড়ে মারা হয়, যা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে সাগরেই আঘাত হানে। প্রাথমিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি নতুন ধরনের কৌশলগত অস্ত্র এবং তা পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূমি থেকে ভূমিতে উেক্ষপণযোগ্য। ক্ষেপণাস্ত্রটি উত্তর কোরিয়ার বহরে প্রচণ্ড শক্তি যুক্ত করেছে।

 

খুশি কিম জং উন

উত্তর কোরিয়া দাবি করেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি একটি আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন নিজে পরীক্ষাটি তত্ত্বাবধান করেন। তিনি ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সাফল্যে ব্যাপক সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পদক্ষেপকে ‘ক্ষমতার প্রদর্শন’ বলে বর্ণনা করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী। নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা অঙ্গীকার করেছেন, তাঁরা পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় জোরদার করবেন। কনফারেন্স কলের মাধ্যমে এক যৌথ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তার এ দুই এশীয় মিত্র দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের ওই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশটি গত বছর দুটি পারমাণবিক ও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার যেকোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর পর থেকে তাদের ওপর জাতিসংঘ ছয় দফা অবরোধ আরোপ করার পরও দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করেনি। আর এ ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার যুক্তি, তারা প্রতিরক্ষার স্বার্থেই এ ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহার করছে।

 

অবরোধ দ্বিগুণ করতে জাতিসংঘের আহ্বান

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে জাতিসংঘ সনদের বড় লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। দেশটির ওপর আরোপিত অবরোধ দ্বিগুণ করতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বসংস্থাটি। উত্তর কোরিয়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিজেদের পঞ্চম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। জবাবে নিরাপত্তা পরিষদ তাদের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে একটি নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব পাস করে। এটি পুরোপুরি বহাল হলে দেশটির কয়লা ও ধাতব পণ্যসামগ্রী রপ্তানি ব্যাপক বাধার মুখোমুখি হবে।

 

প্রতিক্রিয়া, নিন্দা ও হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উত্তর কোরিয়ার ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তীব্র নিন্দা করেছে। এতে দেশটির মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়াও যোগ দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ কোরিয়া জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের ‘সফল’ পরীক্ষা চালানোর ঘোষণা দেওয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৩ ফেব্রুয়ারি এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করে।

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈরীভাবাপন্ন দেশ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রতি শতভাগ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে ট্রাম্প এশীয় মিত্র দেশটির নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হয়াং গিও-আন উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ‘শাস্তি’ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই উত্তর কোরিয়াকে এই মর্মে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে, যেকোনো পারমাণবিক হামলার ‘কার্যকর ও বিধ্বংসী’ জবাব দেওয়া হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র কখনোই উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে মেনে নেবে না।

 

ট্রাম্প ও কিম জং উনের দাবি

গত ২ জানুয়ারি দায়িত্ব নিতে যাওয়ার আগে এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে—এমন কোনো পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কোরিয়া তৈরি করতে সক্ষম হবে না। ওই টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশবিশেষে আঘাত হানতে সক্ষম পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির শেষ পর্যায়ে রয়েছে দেশটি। কিন্তু এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না। ’ তবে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন গত জানুয়ারি মাসে ঘোষণা দেন, তাঁর দেশ পরমাণু যুদ্ধাস্ত্রবাহী আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষামূলক উেক্ষপণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।


মন্তব্য