kalerkantho


ট্রাম্পের শরণার্থী ও মুসলিম নিষেধাজ্ঞা

কুদরাত-ই-খুদা বাবু   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ট্রাম্পের শরণার্থী ও মুসলিম নিষেধাজ্ঞা

২১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবৈধ অভিবাসীদের তল্লাশি করে বিতাড়নের নির্দেশ জারি করেছেন তিনি।

পাশাপাশি সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। অভিবাসন কড়াকড়ি করার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। তাঁর এমন নির্বাহী আদেশের ফলে অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে ভীতি এবং শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা বিশ্বজুড়ে। ওই সাত দেশে দেওয়া প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ভিসা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাজুড়ে সন্দেহ, উদ্বেগ এবং উত্তেজনার সৃষ্টির পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোতে আসা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।   বহুল আলোচিত ওই নির্বাহী আদেশের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শুরু হয়েছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ

কর্মসূচি।

 

সাত মুসলিম দেশের প্রতি নিষেধাজ্ঞা       

২৭ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ইরান, ইরাক, সোমালিয়া, সুদান, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন—এই সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ইরান ও ইরাকের মুসলিম নেতারা ইতিমধ্যে ওই আদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা জানিয়ে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। জার্মানি ট্রাম্পের এই আদেশের সমালোচনা করেছে।

যুক্তরাজ্য অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স ও কানাডা এই আদেশের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। সিনেটের শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্রেটিক সদস্য চাক শুমার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ট্রাম্পের এই ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ সিদ্ধান্ত মার্কিন ভূখণ্ডে নিঃসঙ্গ চরমপন্থাকেই উৎসাহিত করবে। সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির রিপাবলিকান সদস্য কোরি গার্ডনার বলেছেন, নির্বাহী আদেশটির ব্যাপ্তি অনেক বড় এবং এটা সংশোধনের প্রয়োজন আছে। ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত সিনেটর জন ম্যাককেইন সম্প্রতি এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্বাহী আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নিজের পায়ে কুড়াল মারার সমতুল্য হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, হলিউডের শক্তিমান অভিনেতা ও ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সাবেক গভর্নর আরনল্ড শোয়ার্জনেগারসহ নামি-দামি অনেক ব্যক্তিত্ব এ আদেশের তীব্র নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করেছেন।

 

ট্রাম্পের যুক্তি

ট্রাম্প তাঁর ওই আদেশের বিষয়ে বলেন, উগ্রপন্থীদের যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রাখাই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি ৯/১১ হামলার কথা তিনবার উচ্চারণ করেন। ৯/১১ হামলাকারী ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই সৌদি নাগরিক হলেও নিষেধাজ্ঞা তালিকায় সৌদি আরব নেই। ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, গ্রিন কার্ডধারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি তিনি ফেসবুক পোস্টে বলেন, তাঁর নীতি মুসলিমদের নিষিদ্ধ করা নয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে টুইটারে তিনি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে লড়াইয়ের প্রকৃতিকে নগ্নভাবে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিস্টানদের ব্যাপক হারে মারা হচ্ছে। আমরা এই ভয়াবহতা অব্যাহত রাখার অনুমোদন দিতে পারি না!’ অথচ আইএসের হাতে মৃত্যুবরণ করা বেশির ভাগ লোকই মুসলিম।

 

নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা, আদালতে স্থগিত

নাগরিক অধিকারের পক্ষে কাজ করা সংগঠন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাতটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে মার্কিন সরকার ধর্মীয় বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অধিকার লঙ্ঘন করেছে। এসিএলইউ নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়া আদালতে ইয়েমেনের একজনসহ তিন ছাত্রের পক্ষে এ মামলাটি দায়ের হয়।

এদিকে ওয়াশিংটনের অ্যাটর্নি জেনারেল বব ফার্গুসনের করা একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ফেডারেল বিচারক জেমস রবার্ট ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ওপর দেশজুড়ে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেন।   তবে আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা আবার বহাল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ৪ ফেব্রুয়ারি এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট বিচারককে আইন কার্যকরের বিষয়টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার দায়ে অভিযুক্ত করে তাঁকে ‘তথাকথিত বিচারপতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

ট্রাম্পের আপিল

মুসলিমপ্রধান সাত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার ওপর আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিলকারীদের মধ্যে ট্রাম্প ছাড়াও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী জন কেলি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রয়েছেন। আপিলে ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিম শরণার্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, শরণার্থী কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী নয়, বরং নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা মানুষ। কোনো উপাত্তই প্রমাণ করতে পারেনি যে মুসলমান কিংবা অন্য শরণার্থীরা সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে দেশের নাগরিকের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কলমের খোঁচার এই আদেশ বিরক্তিকর, ভয়ংকর এবং উদ্ভটও, যাতে ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে।

 

নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের আরজি খারিজ

মুসলিমপ্রধান সাত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের আরজি খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় একটি আদালত। ৫ ফেব্রুয়ারি সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আপিল আদালতের নবম সার্কিট আদেশটি বহাল রাখার পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি অগ্রাহ্য করে তা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে এ-সংক্রান্ত আদেশ দেন।


মন্তব্য