kalerkantho


সীমানাপ্রাচীর প্রশ্নে মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র

তামান্না মিনহাজ    

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাহী আদেশ জারির ক্ষেত্রে রীতিমতো রেসের ঘোড়ার মতো ছুটছেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাত্র দেড় সপ্তাহের প্রেসিডেন্সিতে এ পর্যন্ত ১৫টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন তিনি।

যা স্বস্তির তুলনায় ক্ষোভ-খেদ-উদ্বেগ-অস্বস্তিরই জন্ম দিয়েছে বেশি। তেমনই একটি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই তিনি মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল তোলার কথা বলে এসেছেন। দায়িত্ব হাতে নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় দেয়াল তোলার নির্বাহী আদেশে সই করে রীতিমতো কাজ শুরুর আয়োজন করে ফেলেন তিনি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এই ব্যয়ের পুরোটাই বহন করবে মেক্সিকো! বিষয়টি নিয়ে শুরুতেই বেঁকে বসে প্রতিবেশী দেশটি। তারা ট্রাম্পের প্রচারের সময়ই স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, একটি পয়সাও এ খাতে খরচ করবে না তারা। দুই দেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য এক হাজার ৯০০ মাইল।

 

অর্থনৈতিক সম্পর্ক

প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা হাতি আর বিড়ালের মতো। বিশাল অর্থনীতির যুক্তরাষ্ট্রের পাশে মেক্সিকো সেই অর্থে শক্তিশালী কোনো দেশ নয়।

তবে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুবই জোরদার বলা চলে, বিশেষ করে মেক্সিকোর দিক থেকে। ১৯৯৪ সালে সই হওয়া নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের (নাফটা) কারণে বাণিজ্যিকভাবে আরো কাছে চলে আসে দেশ দুটি। নাফটার শুল্পমুক্ত সুবিধার কারণে মেক্সিকোর ৮৫ শতাংশ পণ্যই রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। মেক্সিকোর শ্রমবাজার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেকটাই সস্তা। ফলে বহু কম্পানি তাদের কারখানা যুক্তরাষ্ট্র থেকে গুটিয়ে মেক্সিকোতে নিয়ে যায়। এসব পণ্যই কম দামে শুল্পমুক্ত সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়।

 

তিক্ততা চরমে

দেয়াল বিতর্কে মেক্সিকোর সঙ্গে কার্যত এক বাণিজ্যযুদ্ধ বাধিয়ে বসেছেন ট্রাম্প। ৩১ জানুয়ারি বাণিজ্য ও অভিবাসন প্রশ্নে ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতোর ওয়াশিংটনে যাওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল নির্মাণের নির্বাহী আদেশে সই করে ট্রাম্প জানান, তিনি এর পুরো অর্থই প্রতিবেশী দেশটির কাছ থেকেই আদায় করবেন। আবারও তা নাকচ করে দেয় মেক্সিকো। টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, অর্থ না দিলে সফরের প্রয়োজনীয়তাও আর থাকে না। সফর বাতিল করে দেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট।

 

সংকট বাড়বে

সীমানা দেয়াল তৈরি করা নিয়ে মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিক্ততা বাড়লে উভয় দেশই বড় ধরনের সংকটে পড়বে—বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করছেন। প্রায় তিন দশকের মধ্যে উত্তর আমেরিকার এ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে এটাই সবচেয়ে বড় ফাটল বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চাপের মুখে মেক্সিকো তাদের গুয়াতেমালা সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসী প্রবেশ বন্ধে কঠোর হয়। গত বছর তারা এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৭০ অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৯০০। ট্রাম্প যদি মেক্সিকোর সঙ্গে তিক্ততা তৈরি করেন, তবে তারা অভিবাসী নিয়ন্ত্রণের রাশ আলগা করে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

প্রভাব পড়বে প্রাণিজগতেও

এই দেয়াল দূরত্ব তৈরি হবে প্রাণিজগতেও। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত অঞ্চল পশুপাখির জন্য এক অবাধ বিচরণক্ষেত্র। অনেক প্রাণী প্রতিনিয়ত স্বজাতির সঙ্গে দেখা করতে এদেশ-ওদেশ করে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকার বিপন্ন জাগুয়ার, কালো ভালুকও রয়েছে। তাদের এই বিচরণ আটকে দেওয়া হলে প্রাণিকুলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ ছাড়াও দেয়াল দুই দেশের মধ্যে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যকার প্রায় এক হাজার ৯০০ মাইলের সীমান্তের অনেক এলাকা খালি, ধুলোময় মরুভূমি, ঘন সবুজ  ঝোপঝাড়, রিও গ্রান্দে নদী ঘিরে উঁচু-নিচু পথ। তবে দীর্ঘ এই সীমান্তের মধ্যে এখন প্রায় ৬৫০ মাইল জায়গায় ছাড়া ছাড়া বেড়া দেওয়া আছে। ট্রাম্প বলেছেন, এক হাজার মাইলজুড়ে হবে এ দেয়াল। আর বাকিটা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে নিরাপদ থাকবে।

 

হিসাবে কেমন কী?

এই দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণে কত খরচ হবে, আর তা আসবে কোথা থেকে—এ হচ্ছে বিশাল প্রশ্ন। ট্রাম্প যদিও বলছেন, অল্প খরচেই তিনি বিশাল দেয়াল নির্মাণ করবেন, যা তাঁর আগে কেউ করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, এই দেয়াল তৈরিতে ব্যয় হবে এক থেকে দেড় হাজার কোটি ডলার। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা মনে করছেন, এই খরচ ট্রাম্পের হিসাবকে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাবে। মেক্সিকোর সঙ্গে ৬৫০ মাইলজুড়ে থাকা দুর্বল বেড়ার সীমান্ত নির্মাণেই খরচ হয়েছে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেয়াল করতে গেলে তা প্রত্যন্ত, দুর্গম, এমনকি পাহাড়ি এলাকার ওপর দিয়েও যাবে। ফলে খরচ বাড়বে। এ ছাড়া এই এক হাজার মাইলের মধ্যে অনেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও রয়েছে। এগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কিনতে হবে অথবা মালিকের কাছ থেকে আর্থিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে নিতে হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেয়াল করতে গেলে খরচ গিয়ে পৌঁছবে আড়াই হাজার কোটি ডলারে।

 

অর্থ আদায়ে ট্রাম্পের ছক

ট্রাম্প শুরু থেকেই এই দেয়াল নির্মাণের খরচ মেক্সিকোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বারবার বলছেন, মেক্সিকোকে এই খরচ দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের কোনো খরচ দেবেন না। তাহলে মেক্সিকোকে কিভাবে বাধ্য করবেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বাড়িতে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে খেসারত দিতে বাধ্য করা হবে। আর এটি করা হবে ইউএস প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট অনুযায়ী। এই আইন সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান বন্ধ করতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ট্রাম্প কি সত্যি এ আইনের ব্যবহার করতে পারবেন? এমন প্রশ্ন উঠলে ট্রাম্প বলেন, না হলে তাঁর কাছে অন্য উপায় আছে। যেমন ভিসা আবেদনের ফি বৃদ্ধি, সীমান্ত পারাপার কার্ডের চার্জ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য শুল্ক জোরদার করা ইত্যাদি। ওয়াশিংটন বলেছে, এই খরচ তুলতে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর পণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক নেওয়া হবে। এরই মধ্যে মেক্সিকো সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে। বলেছে, এতে মার্কিন নাগরিকরাই বিপদে পড়বে। কর আরোপের ফলে মেক্সিকোর পণ্য তাদের আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হবে।

 

মেক্সিকোর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব

হোয়াইট হাউসের করারোপের বক্তব্যের পর মেক্সিকান পেসোর মান কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্ভাব্য সংঘাত তাদের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয়। সীমান্ত দিয়ে গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, খামারপণ্য, বস্ত্র ও খাদ্য অবাধে যাওয়া-আসা করে। পণ্যের এ অবাধ প্রবাহ ব্যাহত হলে দুটি অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গাড়ি নির্মাতারা। বিশেষ করে মেক্সিকোয় মার্কিন গাড়ি কম্পানি ফোর্ড মোটর, জেনারেল মোটরস ও ফিয়াট ক্রাইসলারের কারখানা থাকায় তারা সংকটে পড়বে। জাপানের হোন্ডা মোটর, মাজদা মোটর করপোরেশন ও জার্মানির ভক্সওয়াগনসহ বেশ কিছু বিদেশি গাড়ি নির্মাতা কম্পানির কারখানা মেক্সিকোয় হওয়ায় এ কম্পানিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই কম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে যন্ত্রাংশ রপ্তানি করে থাকে। এ ছাড়া ওয়ার্লপুল করপোরেশন ও জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো অন্যান্য কম্পানি, যেগুলো নাফটা চুক্তির কারণে সুবিধা ভোগ করে, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


মন্তব্য