kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সংকটে সার্ক

তামান্না মিনহাজ

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নানা পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)। অভিন্ন দক্ষিণ এশিয়ার পরিচয় তুলে ধরতে বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে শুরু হয় পথ চলা।

যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) শুরু, দীর্ঘ ৩১ বছর পরও সেটি মোটামুটি প্রতীকী সংগঠনই থেকে গেছে। অতীতের বিভিন্ন পর্যায়ে আট জাতির এই জোট ভারত ও পাকিস্তানের বৈরিতায় বারবার হোঁচট খেয়েছে। এবারই প্রথমবার দেখা গেল, শুধু এই দুই দেশই নয়, বাংলাদেশসহ আরো চারটি দেশ একসঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপড়েনকে আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে বাধা বলে মনে করছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের কথা ছিল। একের পর এক সদস্যদের অসম্মতিতে ভেস্তে গেছে সম্মেলন।

দীর্ঘদিন খুঁড়িয়ে চলা সার্কের ভবিষ্যৎ এখন গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। তিন দশকের ইতিহাসে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়া কিংবা পিছিয়ে যাওয়াটা নতুন নয়। তবে কাছাকাছি সময়ে পাঁচটি দেশের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা এবারই প্রথম। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত ও আফগানিস্তানের চরম উত্তেজনা আর বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের অযাচিত হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক সহযোগিতায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দ্বিপক্ষীয় টানাপড়েনের জের ধরে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হয়ে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় আঘাত।

 

সার্ক কী?

সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। এর সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তান। গণচীন ও জাপান সার্কের পর্যবেক্ষক। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় সার্ক। সার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান। এসব দেশের নেতারা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতা করার লক্ষ্যে চুক্তি করেন। ২০০৭ সালে আফগানিস্তানকে সার্কের সদস্যপদ দেওয়া হয়। সার্কের সদর দপ্তর নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে।

 

সংকটের কারণ

বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও ভুটান সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জোটের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপালকে জানায়। পাঁচ দেশ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সার্কের শীর্ষ নেতাদের সম্মেলনটি স্থগিত হয়ে যায়। এ ছাড়া স্বাগতিক দেশ পাকিস্তান যেভাবে সদস্য দেশগুলোকে শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেটিও নজিরবিহীন। গত মার্চে নেপালের পোখরায় সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের হাতে সার্কের আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন। সাধারণত স্বাগতিক দেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা সরকারপ্রধানের বিশেষ দূত হিসেবে কাউকে সদস্য দেশগুলোতে পাঠিয়ে শীর্ষ সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে।

 

ভারত-পাকিস্তান চিরায়ত সমস্যা

কাশ্মীর নিয়ে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের উত্তেজনার মধ্যে ভারত এবারের সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত মাসের শেষদিকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে পাকিস্তানে যাবেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্প্রতি ভারত শাসিত কাশ্মীরে সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানকে এর জন্য দায়ী করে নয়াদিল্লি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনেও এ নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ায়। নয়াদিল্লি ইসলামাবাদ সম্মেলন বয়কটের কথা জানিয়ে পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে বলেছে, সন্ত্রাস ও সহযোগিতা একসঙ্গে চলতে পারে না।

কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে বিরোধে দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে সংস্থা হিসেবে সার্কের টিকে থাকার বিষয়টিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমনিতেই সার্কের কার্যক্রমের নিয়ম অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই। সার্কের সভাপতি দেশ নেপালকে ভারত জানিয়েছে, এ অঞ্চলে আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় এবং সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দেশের হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা নভেম্বরে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সহায়ক নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যোগাযোগের ব্যাপারে ভারত তার অঙ্গীকারের ব্যাপারে অবিচল আছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

১৮ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৮ সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। বিষয়টি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ভুটান ও আফগানিস্তান বলেছে, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে এ অঞ্চলে তৈরি হওয়া উত্তেজনার কারণে তারা পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাবে না।

সার্কের নিয়ম অনুযায়ী, জোটভুক্ত একটি দেশও সম্মেলনে অংশ নিতে অপারগ হলে সেই সম্মেলন স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। জোটের অধিকাংশ দেশ অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান নেপাল সম্মেলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়।

 

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অব্যাহতভাবে নাক গলানোয় ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ মনে করছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ কিছু ঘটনায় আস্থার জায়গায় নেই। পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, তাতে আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছে, পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করেছে। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তান মনোভাব বদলায়নি। বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট হয়েছে। সার্কের স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনেও বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। এই নীরব প্রতিবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। তবে পাকিস্তানের মনোভাব বদলায়নি।

 

সার্কের ভবিষ্যৎ কী

সদস্য পাঁচ দেশের সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণাকে ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছে পাকিস্তান। সার্ক সংকটের জন্য ভারতকে দায়ী করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সমগ্র বিশ্ব জানে, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হোতা ও অর্থদাতা ভারত।

ভারতের ইন্ডিয়া টুডে এক খবরে জানিয়েছে, সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ হিসেবে নেপাল শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনে ইসলামাবাদের বিকল্প স্থান খুঁজতে শুরু করেছে। কাঠমাণ্ডুতে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ড বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াকে একসূত্রে গাঁথার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণের পথে বারবারই দিশা হারিয়েছে সার্ক। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জোটের বড় দুই সদস্যের বৈরী সম্পর্কের কাছে জিম্মি হয়ে থেকেছে। শীর্ষ সম্মেলন না হলে বিভিন্ন স্তরের বৈঠক করে সার্ককে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও কমে আসছে। অতীতে একসঙ্গে পাঁচ দেশের সরে দাঁড়ানোর নজির নেই। স্বাগতিক দেশের ভূমিকা নিয়ে অন্য দেশের প্রশ্ন তোলার বিষয়টিও আগে ঘটেনি। ফলে সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ সংকটে পড়ে গেল।


মন্তব্য