kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভারত-পাকিস্তান কি যুদ্ধে জড়াবে?

সানজিদ সাদ   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভারত-পাকিস্তানের বৈরিতা চিরকালের। ১৯৪৭ সালে দৃশ্যত বৈরিতার মধ্যেই রাষ্ট্র দুটির জন্ম।

নানা সময়ে যুদ্ধ ও সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুটি দেশ। সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সদর দপ্তরে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা পৌঁছেছে চরম পর্যায়ে। উরির কাছের পাক-ভারত সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে দুই দেশ। সীমান্তবর্তী এলাকায় বেড়েছে দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি। কোনো পক্ষ প্রথম হামলা চালালে জবাব দিতে প্রস্তুত অপর পক্ষও। নিয়মিত বিরতিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের আকাশে উড়ছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। ইসলামাবাদ ও লাহোর শহরের সড়কে যুদ্ধবিমান নামানোর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এদিকে ভারত তাদের সমরাস্ত্রের ভাণ্ডারে নতুন যুক্ত হওয়া এমআইসিএ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, ভারত ও পাকিস্তান কি যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছে?

উরি হামলা

১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে জম্মু-কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উরি এলাকার সেনা ব্রিগেডের সদর দপ্তরে হামলা হয়। এতে ১৮ সেনা ও চার হামলাকারী নিহত হন। এ ছাড়া ওই ঘটনায় আহত ৩৫ সেনাকে সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলার পরপরই এর জন্য পাকিস্তানপন্থী জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদকে দায়ী করে। হামলার পর যে চারজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে তাদের কাছে একে ৪৭ রাইফেল, গ্রেনেড লঞ্চার এবং অন্য যেসব সামরিক সরঞ্জাম পাওয়া গেছে তাতে পাকিস্তানি ছাপ ছিল। এই হামলার কড়া জবাব দিতে চান ভারতীয় সেনারা। ঘটনাটি ঘটেছে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর। ১৯৪৮ সাল থেকে কাশ্মীরের এই নিয়ন্ত্রণ রেখা অনিচ্ছাকৃতভাবে মেনে চলছে উভয় রাষ্ট্র।

সাম্প্র্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

দুই মাস ধরে ভারত শাসিত কাশ্মীরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কাশ্মীরি নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ উত্তেজনা দেখা দেয়। ওই ঘটনার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীদের দ্বন্দ্ব্ব-সংঘর্ষ চলে আসছিল। এরই মধ্যে সেখানে ৮৫ জন কাশ্মীরি হত্যার শিকার হয়েছেন। ১১ বছরের এই স্কুলছাত্র নাছির সাফিকে ভারতীয় বাহিনী গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এতে উপত্যকায় উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে উরি হামলা হলো।

জন্ম থেকেই বিরোধ

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের মধ্যেই বিরোধের উৎসমূল নিহিত। ভারত বিভাগ আইন অনুযায়ী হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয়, দেশীয় রাজ্যগুলো তাদের নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে। রাজ্য কাশ্মীরের শাসক ছিলেন হিন্দু। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান। হায়দরাবাদ পাকিস্তানে যোগ দিলেও সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। উভয় রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীত ঘটনা ঘটে। কাশ্মীরের জনগণ পাকিস্তানে যোগদানের জন্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অপরদিকে হায়দরাবাদের হিন্দু জনগণ ভারতে যোগ দিতে চায়। ভারত হায়দরাবাদকে একীভূত করে নেয়। পাকিস্তান সরকার কাশ্মীরকে একীভূত করে নিতে চায়। কাশ্মীরের রাজা ভারতে যোগ দেওয়ায় ভারত কাশ্মীরের বেশির ভাগ দখল করে নেয়। পাকিস্তান দখল নেয় উত্তর-পূর্ব সীমান্তে। সেই থেকে কাশ্মীর বিভক্ত। কিন্তু উভয় রাষ্ট্রই কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভাজনের চেয়ে এখন কাশ্মীরের বিভাজন রেখা চিরশত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে দুটি দেশ ১৯৪৮ ও ১৯৬৫ সালে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে অনেকবার। বিরোধটি ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘে উত্থাপিত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ভিত্তিতে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। উভয় রাষ্ট্র গণভোটের প্রস্তাব মেনে নেয়। ভারত কখনোই বাস্তবে গণভোটের প্রস্তাব কার্যকর হতে দেয়নি।

যুদ্ধংদেহী অবস্থান

হামলার পরপরই এক যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং হামলার পরপর টুইট করেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এ দেশকে সমগ্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই, এই জঘন্য হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ’

হিন্দুত্ববাদী শাসক বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাদপ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কৌশলগত সংযমের সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। সন্ত্রাস হচ্ছে ভীতু ও দুর্বলের কাজ। যদি এ ধরনের বারবার হামলার জবাব দেওয়া না হয়, তাহলে তা হবে অযোগ্যতা ও অদক্ষতার প্রমাণ।

পাকিস্তান এক বিবৃতিতে ভারতের প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছাকে বলেছে, ‘সেটি হবে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ’ উভয় দেশের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে সমরবিশারদরা বলেছেন, ভারতের প্রতিশোধস্পৃহার কারণে যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া

উরি হামলার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তীব্রতর করেছে। এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার কারণে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এ ধরনের যুদ্ধের পরিণতি হবে ভয়ংকর। যদিও দৃশ্যত গতানুগতিক যুদ্ধে ভারতের রয়েছে বিপুল সামরিক প্রাধান্য, পাকিস্তান যদি এই প্রাধান্যের জবাব পারমাণবিক শক্তি দিয়ে দিতে চায়, তাহলে তা উভয় দেশের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে।

উভয় রাষ্ট্রের যুদ্ধপ্রস্তুতি আন্তর্জাতিক সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এরই মধ্যে এই অঞ্চলকে বিশ্বের সর্বাধিক পারমাণবিক বিপজ্জনক এলাকা বলে উল্লেখ করেছেন।

চীন সব সময়ই পাকিস্তানের পক্ষে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এক বিবৃতিতে উরি হামলার নিন্দা ও ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

ভারতের হামলার আশঙ্কা করছে পাকিস্তান

পাকিস্তানের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে যে ভারতীয় সেনাবাহিনী ক্রমেই পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি সরে আসছে। ভারত যেকোনো মুহূর্তে পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারে—এমন একটি আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে সেখানে। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে এ নিয়ে বেশ সতর্কাবস্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের সঙ্গে আলাপ করেছেন।

ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের মধ্যকার প্রধান মহাসড়কের কিছু অংশও বন্ধ রাখা হয়েছে।

২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হবে

চিরবৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে অন্তত ২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। গবেষণামূলক এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করা হয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার এবং ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি—সংগঠন দুটি এই গবেষণামূলক প্রতিবেদন তৈরি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দুই দেশের মধ্যে সীমিত পর্যায়েও পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই হলে বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলের ব্যাপক ক্ষতি ও শস্যক্ষেত্র ধ্বংস হবে। পরিণামে খাদ্যপণ্যের বিশ্ববাজারে বহু গুণ খারাপ প্রভাব পড়বে।

এর আগে সংগঠন দুটি ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে ধারণা দিয়েছিল, এ রকম একটি পারমাণবিক যুদ্ধে ১০০ কোটির বেশি মানুষ মারা যেতে পারে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি অত্যাসন্ন?

উপমহাদেশের এই দুটি দেশে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় অঘটন ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন, উভয় পক্ষ যেহেতু পারমাণবিক শক্তিধর—সমানে সমান, সুতরাং তারা নিশ্চয়ই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে না।


মন্তব্য