kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা চুক্তি

সানজিদ সাদ   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা চুক্তি

ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা—সর্বত্র নিন্দার ঝড়। জাতিসংঘও সরব।

কিন্তু গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের ঘটনায় ওয়াশিংটন নরম সুরে ‘উদ্বিগ্ন’। অথচ ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর অজুহাতে গাজায় স্থল ও আকাশপথে চালানো সামরিক অভিযানের সমর্থনে ওয়াশিংটনের কণ্ঠ সব সময়ই বেশ জোরালো। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও ইসরায়েলের পরম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলবিরোধী যেকোনো প্রস্তাবে ভেটো দিতে তারা একপায়ে খাড়া। বিভিন্ন বিষয়ে মার্কিন সিনেটরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু একটি ক্ষেত্রে—ইসরায়েল প্রশ্নে সব সিনেটর এক জোট। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার এই বন্ধনের রহস্যজট খুলতে গিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি কয়েকটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যকার নীতি ও মূল্যবোধের মিল, ভূ-রাজনীতি, ভোটব্যাংক, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী লবি প্রভৃতি।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর তেল আবিবকে শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। শুধু তা-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই মিত্রটিকে নিয়মিত অস্ত্রও সরবরাহ করে আসছে মার্কিন প্রশাসন। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে তিন হাজার ৮০০ কোটি ডলারের একটি নতুন সামরিক সহায়তা চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

৩৮০০ কোটি ডলারের সামরিক চুক্তি

‘বিপজ্জনক প্রতিবেশীদের থেকে রক্ষার জন্য’ ইসরায়েলকে রেকর্ড পরিমাণ সামরিক সহায়তা দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১০ বছর মেয়াদি ওই সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলকে তিন হাজার ৮০০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় অঙ্কের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহায়তা। তবে ইসরায়েল এই চুক্তির বাইরে অন্য কোনো সামরিক সহায়তা চাইতে পারবে না বলেও শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন অর্থ সামরিক সরঞ্জাম কেনা, মেরামত ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারবে ইসরায়েল। তবে এর বিনিময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বড় ধরনের ছাড় পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ১০ মাসের আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে ওই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বছরে ৩৮০ কোটি ডলার করে সামরিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

 

ইরান ইস্যুতে বিভক্ত দুই মিত্র

গত বছর সম্পাদিত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি নিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতবিরোধ চলছিল। নেতানিয়াহুর খোলামেলা নিন্দাসূচক বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্কে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে না জড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাবধান করে দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কিছুটা দ্বিমত তৈরি হয়। এসব কারণে বর্তমান সামরিক চুক্তি চূড়ান্ত করতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগে।

ইরানের পারমাণবিক গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে মতভেদ ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের। ইসরায়েলের চাওয়া ছিল, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হোক। অন্যদিকে সামরিক বল প্রয়োগ না করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঐতিহাসিক ফোনালাপ ইসরায়েলের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইউনেসকোর ভোটাধিকার প্রসঙ্গ

দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা পরিশোধ না করায় মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভোটাধিকার স্থগিত করে জাতিসংঘের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। ২০১১ সালে ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ দেওয়ার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ইউনসকোকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে। ইসরায়েলও একই সময় থেকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে। ফলে দীর্ঘদিন বকেয়া থাকার কারণে তারও ভোটাধিকার স্থগিত করা হয়েছে। এ দুই দেশের অভিযোগ, ইউনেসকো মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে ফিলিস্তিনিদের স্বীকৃতি দিয়েছে।

 

গোপন সামরিক মহড়া

গত মাসে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে গোপনে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে এই সামরিক মহড়াটি ইসরায়েলের নেজেভ মরুভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়। মহড়ায় অংশ নেয় মার্কিন মেরিন সেনা ও ইসরায়েলের বিমান, নৌ ও পদাতিক বাহিনীর স্পেশাল ইউনিটের সেনারা।

 

বন্ধুত্বে চড়াই-উতরাই

স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও প্রথম দিকে দুই দেশের সম্পর্ক মসৃণ ছিল না। ১৯৫৬ সালে মিসরে ইসরায়েলের আগ্রাসন সমর্থন করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ষাটের দশক পর্যন্ত তেল আবিবের কাছে অস্ত্রের বড় চালান বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানায় ওয়াশিংটন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধপূর্ণ মনোভাবের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন-তেল আবিবের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। মার্কিন খ্রিস্টানরা ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে থাকে। এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের শক্তিশালী লবি রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনকে তেল আবিবের পক্ষে নিতে তারা সদা তত্পর।


মন্তব্য