kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কে হচ্ছেন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব?

তামান্না মিনহাজ    

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে বর্তমান মহাসচিব দক্ষিণ কোরীয় বান কি মুনের মেয়াদ।

১০ বছর এ পদে দায়িত্ব পালন করলেন তিনি। আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন নবম মহাসচিব। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনে এবারের মহাসচিব নির্বাচন শুরু হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে আছেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘের সাবেক উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনার আন্তোনিও গুতিরেস। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে মহাসচিব হিসেবে কোনো নারী নিয়োগের কথা উঠলেও সময়ের সঙ্গে তা প্রায় মিলিয়ে গেছে।

 

জাতিসংঘ

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত সংগঠন জাতিসংঘ। যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি ও মানবাধিকার বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৯৪৫ সালে ৫১টি রাষ্ট্রের জাতিসংঘ সনদে সই করার মধ্য দিয়ে বিশ্বসংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং পরে বিলুপ্ত লিগ অব নেশনসের স্থলাভিষিক্ত হয় জাতিসংঘ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে যুদ্ধ ও সংঘাত এড়াতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয় বিজয়ী মিত্রশক্তি। জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে। এর প্রধান অঙ্গসংস্থাগুলো হলো—সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, সচিবালয়, ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক আদালত। এ ছাড়া রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ইত্যাদি। সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। সর্বশেষ সদস্যপদ পায় দক্ষিণ সুদান, ২০১১ সালে।

 

মহাসচিবের দায়িত্ব

জাতিসংঘ মহাসচিবের ভূমিকা বিষয়ে সনদের ৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, তিনি শুধু সচিবালয়ের প্রশাসনের দায়িত্বই পালন করবেন না, তাঁকে পুরো জাতিসংঘের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করতে হবে। তিনি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ওই সনদে আরো বলা হয়েছে, যেকোনো বিশ্বশান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা ও নিরাপত্তার খাতিরে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে মহাসচিব  নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আনতে পারবেন।

 

শেষ হচ্ছে বান কি মুনের মেয়াদ

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর। এ সময়ের মধ্যেই জাতিসংঘের অষ্টম মহাসচিবের উত্তরসূরি নির্বাচন করতে হবে। বান কি মুন ২০০৭ সালে কফি আনানের কাছ থেকে দায়িত্ব নেন। প্রথা অনুসারে তিনি দুবারে ১০ বছর সংস্থাটির পরিচালনার ভার বহন করেছেন। যদিও সনদে মহাসচিবের মেয়াদকালের কোনো উল্লেখ নেই। ১৯৪৬ সালে সাধারণ পরিষদে এক প্রস্তাবে মহাসচিবের মেয়াদকাল প্রথমে পাঁচ বছর এবং পরে যোগ্যতার ভিত্তিতে আরো পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করা যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ওই সময় এ-ও বলা হয়, অভিজ্ঞতার আলোকে এ মেয়াদে পরিবর্তন আনা যাবে। ১৯৫০ সালে ট্রাগভি লি তিন বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ পেয়েছিলেন। মিয়ানমারের উ থান্ট এক বছর চলতি দায়িত্বে থাকার পর চার বছরের জন্য নিয়োগ পান। ১৯৬৬ সালে উ থান্টের মেয়াদ আবার দুই মাসের জন্য বাড়ানো হয়। তবে প্রচলিত প্রথা হলো, পরপর দুই মেয়াদ—অর্থাৎ ১০ বছরের জন্য মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দুই মেয়াদের পর নতুন কেউ দায়িত্ব নিয়েছেন।

 

নির্বাচনী প্রক্রিয়া

জাতিসংঘ সনদের ৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের পরামর্শ অনুসারে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মহাসচিবের নিয়োগ দেবে। ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের গুরুত্ব ও একই সঙ্গে ‘ভেটো’ দেওয়ার আশঙ্কা সব সময়ই রয়ে যায়। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা নিয়ে অবশ্য সব সদস্য রাষ্ট্রেরই আপত্তি রয়েছে। একটিমাত্র রাষ্ট্রের দেওয়া ভেটোর কারণে বাকি সব সদস্য রাষ্ট্রের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও দাবি নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিতে সমর্থন নেই নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ছাড়া অন্য কোনো দেশেরই। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হলো চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। নিরাপত্তা পরিষদের প্রার্থী নাকচ করে দেওয়ার রেকর্ড থাকলেও সাধারণ পরিষদের এ ধরনের তত্পরতার নজির নেই।

 

সম্ভাবনা বেশি কার?

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নেওয়া তৃতীয় অনানুষ্ঠানিক ভোটেও প্রথম হয়েছেন আন্তোনিও গুতিরেস। দ্বিতীয় স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিরোস্লাভ লাইচাক। আর যৌথভাবে তৃতীয় ইউনেসকোর চলতি মহাপরিচালক বুলগেরিয়ার ইরিনা বুকোভা ও সার্বিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুক জেরেমিচ। এই অনানুষ্ঠানিক ভোটে অংশ নেয় নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশ। এই ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী এবং ১০টি অস্থায়ী। এই ভোটের লক্ষ্য মহাসচিব হতে আগ্রহী প্রার্থীদের সংখ্যা দুই বা তিনে কমিয়ে আনা। শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদেরই ভোটের ফল জানতে পারার কথা। কিন্তু তাদের কেউ গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করে দেওয়ায় ফলাফল ফাঁস হয়ে যায়।

 

কোন অঞ্চল প্রাধান্য পাবে

জাতিসংঘে প্রচলিত ‘পর্যায়ক্রমিক’ আবর্তনের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী মহাসচিব পূর্ব ইউরোপের কোনো দেশ থেকে হওয়ার কথা। কিন্তু এবার সে নিয়ম পুরোপুরি রক্ষিত হচ্ছে না। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত আটজন মহাসচিব দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপীয় অঞ্চলের অধিবাসী। গোটা বিশ্বকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ড পরিচালনার রীতি প্রচলিত আছে। অঞ্চলগুলো হলো—এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা। এশিয়া থেকে দুই দফায় (বর্তমান মহাসচিব বান কি মুন ও উ থান্ট), আফ্রিকা থেকে দুই দফায় (বুট্রোস বুট্রোস ঘালি ও কফি আনান) পশ্চিম ইউরোপ থেকে তিন দফায় (ট্রাগভি লি, দাগ হ্যামারশোল্ড ও কুর্ট ওয়েল্ডহেইম) ও লাতিন আমেরিকা থেকে একবার দুই মেয়াদে (হ্যাভিয়ার পেরেজ দ্য কুয়েলার) মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত কেউই নির্বাচিত হননি।

 

এবারের প্রক্রিয়া

এত দিন পর্যন্ত শুধু নিরাপত্তা পরিষদই মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিত। সে অর্থে মহাসচিব নির্বাচনের সাধারণ পরিষদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। এ প্রক্রিয়া নিয়ে বহু দিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা ছিল। এবার জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত এপ্রিল থেকে। সংস্থাটির ৭০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম মহাসচিব হতে আগ্রহী প্রার্থীদের সংস্থার ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি সাক্ষাত্কারের জন্য উপস্থিত হতে হয়েছে। মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় আরো স্বচ্ছতা আনার জন্যই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

গত বছর মহাসচিব পদে নিয়োগ পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনার জন্য সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটিও হয়। অধিকাংশ রাষ্ট্রের সম্মতিতে নতুন এ প্রক্রিয়ায় মহাসচিব পদের প্রার্থীদের আবেদন ও জীবন-বৃত্তান্ত জমা দিতে হয়। পরে সাধারণ পরিষদের সদস্যদের সামনে পেশ করতে হয় বক্তব্য।

শুরুতে চারজন নারীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক ছিলেন। শুরুতে তাঁকেই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী বলে মনে করা হচ্ছিল। পরে অবশ্য তিনি ছিটকে পড়েন। প্রতিযোগিতায় টিকে আছেন ইউনেসকোর চলতি মহাপরিচালক বুলগেরিয়ার ইরিনা বুকোভা। তবে সম্ভাবনা বিচার করতে গেলে তাঁর অবস্থান খুব একটা শক্ত নয়। সামনে থাকা বাকি দুই প্রার্থীকে তিনি টপকে যেতে পারবেন—এমন সম্ভাবনা দৃঢ় নয়।


মন্তব্য