kalerkantho


সফল তিনি

কাজ শেখার আগ্রহ থাকতে হবে

মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই কাজের মাধ্যমে আরোহণ করেছেন সফলতার শীর্ষে। রায়হান আহমদ আশরাফীকে সাফল্যের পেছনের গল্প শুনিয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় করপোরেট হাউস প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব মিডিয়া, প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস তাহমিনা শারমিন রুমকী

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কাজ শেখার আগ্রহ থাকতে হবে

ঢাকা সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক করেছি। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় পারিবারিক কারণে বিয়ে হয়ে যায়।

শ্বশুরবাড়িতে আমার তেমন কোনো কাজের চাপ ছিল না। বেশির ভাগ সময়ই কাটত টিভি দেখে। এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবী এয়ার হোস্টেস হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তখন থেকেই নতুন ভাবনার শুরু—বাসায় বসে থাকার চেয়ে একটা চাকরি করলে মন্দ হয় না। স্বামীকে বলতেই তিনি রাজি হলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই ইন্টারস্পিড অ্যাড এজেন্সিতে একটা পার্টটাইম জবের খোঁজ দিলেন। ভাইভা দিলাম, চাকরিটা হয়ে গেল।

সময়টা ২০০৬ সাল। বেতন পেতাম ছয় হাজার টাকা।

তখন আমি কোনো ধরনের অফিশিয়াল কাজ পারি না বললেই চলে। সহকর্মীরাও এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে আমাকে শেখানোর সময় কই! খণ্ডকালীন চাকরি হওয়ায় অফিসের কাগজপত্রও আমাকে দিতে নিরাপদ বোধ করতেন না। একদিন ফেলে দেওয়া কাগজপত্র থেকে কয়েকটি নিয়ে নিজে নিজেই শেখার চেষ্টা শুরু করলাম। কোনো সমস্যায় পড়লে পাশের সহকর্মীর কাছ থেকে তা সমাধান করে নিতাম। বেশির ভাগ সময় সহকর্মীদের পাশে বসে আড্ডার ছলে তাঁরা কিভাবে কাজ করছেন তা শেখার চেষ্টা করতাম। একদিন জরুরি প্রয়োজনে এক সহকর্মীর ছুটির প্রয়োজন হলো। কিন্তু কাজের চাপে তিনি ছুটিতে যেতে পারছেন না। তাঁর কাজটা আমি করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলাম এবং ঠিকঠাক করেও দিলাম। বসের কানে খবরটি পৌঁছতেই তিনি বেশ খুশি হলেন। পরদিনই চাকরিটা স্থায়ী হয়ে গেল। বেতনও বেড়ে গেল। খণ্ডকালীন থেকে নিয়োগ পেলাম পূর্ণকালীন জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে। কাজটা ছিল প্রেস প্ল্যানিংয়ের। পরে ডাটা অ্যানালাইসিসের কাজও দেওয়া হলো। প্ল্যানিং ও অ্যানালাইসিস উভয় দিকেই ভালো করতে থাকায় ২০০৯ সালে পদোন্নতি দেওয়া হলো প্ল্যানার অ্যান্ড অ্যানালাইসিস হিসেবে।

২০১০ সালের দিকে প্রাণ থেকে একটি ফোন পেলাম। ফোনেই তারা আমাকে চাকরির প্রস্তাব দেয়। প্রথমবারে আমি ‘না’ বলে দিয়েছিলাম। পরে অবশ্য স্বামী ও ইন্টারস্পিডের কয়েকজন সহকর্মীর অনুপ্রেরণায় প্রাণে ইন্টারভিউ দিই। ডিরেক্টর মার্কেটিং ও এইচআর ম্যানেজার ভাইভায় এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে বিকেলেই জানিয়ে দেন চাকরিতে জয়েন করতে। ইন্টারস্পিড ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করছিল না।

কয়েক মাস পর অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মিডিয়া প্ল্যানিং হিসেবে যোগ দিই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে। এখানে সাধারণত ছয় মাসের আগে চাকরি স্থায়ী করা হয় না। মজার ব্যাপার হলো, দেড় মাসের মধ্যে আমার চাকরিই স্থায়ী করা হলো। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে চাকরিজীবন ছয় বছরের। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছি হেড অব মিডিয়া, প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস হিসেবে।

ইন্টারস্পিডে তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান আমাদের ক্লায়েন্ট ছিল। আর প্রাণ-আরএফএলে শতাধিক ব্র্যান্ড ম্যানেজার কাজ করেন। এখানে প্রত্যেক ব্র্যান্ড ম্যানেজারকে একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি মাসে তাঁরা নির্দিষ্ট বাজেট ও কর্মপরিকল্পনা জমা দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে বাজেট বরাদ্দ, কোন খাতে কেমন ব্যয় হতে পারে তা নির্ধারণ করি। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য তাঁরা জানিয়ে দেন এবং সে অনুযায়ী বাজেট তৈরি করি ও পরামর্শ দিই।

প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস বিভাগের কাজ হলো গবেষণা করে নতুন নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্যই থাকে পণ্যের প্রচার ও বিক্রি বাড়ানো। কোনো পরিকল্পনা যখন সফল হয় তখন আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে কিন্তু আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। এটি নিজের ব্যর্থতা বলে মনে হয়। তখন নতুন করে আরো উদ্ভাবনী পরিকল্পনা তৈরি করি।

প্রাণ আচার প্রতিযোগিতায় গিয়েছিলাম স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে। সেখানে স্বামীর কাছে আমার কাজের বেশ তারিফ করেছিলেন প্রাণ-আরএফএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, আমার কাজ নিয়ে বেশ গর্ববোধ করেন বলে জানান। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তির মুখে এমন প্রশংসা শুনে সেদিন খুব ভালো লেগেছিল। এখানে সহকর্মীরা অনেক বন্ধুসুলভ। পাশাপাশি কোনো একটি কাজে সফল হলেই সঙ্গে সঙ্গে মেলে পুরস্কার। ইন্টারস্পিডে তিন-চারবার পুরস্কার পেয়েছিলাম। সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাণেও পুরস্কার পেয়েছি বেশ কয়েকবার। প্রতিবার সফল হওয়া ও পুরস্কারপ্রাপ্তি কাজে এনে দেয় নতুন গতি।

নিজ কর্মস্থলে যেমনভাবে দায়িত্ব পালন করি, একজন নারী হিসেবে পরিবারের প্রতিও দায়বদ্ধতা থাকে। আমার মা-বাবা ছাড়া আমি একেবারেই অর্থহীন। সত্যিকার অর্থে, মা-বাবার সহযোগিতা ছাড়া যেকোনো কর্মজীবী নারীর জন্যই অফিস ও ঘর সামলানো কঠিন। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তদারকি করতে হয়। কাজটা চ্যালেঞ্জিং। নিয়মিত মার্কেট অ্যানালাইসিস করতে হয়। অফিস সময়ের বাইরে পুরোটা সময় কাটে ছেলে কাশিফ আহমেদ রায়ানের সঙ্গে। ইংলিশ মিডিয়ামে গ্রেড ওয়ান পড়ুয়া ছেলের পড়াশোনার দেখভাল করা, তাকে নিয়ে বেড়ানো, অফিসের কাজের ফাঁকেও ছেলের নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েই দিন কাটে।

শুরু থেকেই আমার মিডিয়ার প্রতি প্রচুর ঝোঁক ছিল। প্রচুর টিভি দেখতাম বলেই হয়তো এমনটা হয়েছে। তাই এ পথেই এসেছি। তরুণদের প্রথমে নিজের আগ্রহের জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে। যে কাজের প্রতি ঝোঁক বেশি, সেদিকেই এগোতে হবে। নিজেকে আপডেট রাখতে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। নিয়মিত ওয়েবসাইট ঘাঁটতে হবে, চোখ রাখতে হবে পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনের পর্দায়। মিডিয়ায় কাজ করতে হলে এজেন্সির মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে। কাজের প্রচুর ক্ষেত্র থাকায় সেখানে শেখার সুযোগও বেশি থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের জন্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ উপযোগী। স্নাতক শেষে ইন্টার্নশিপ করলে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কাজে দেয়।

মোদ্দা কথা, কাজ শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকতে হবে। কাজটা যে রকমই হোক, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা থাকলে জীবনে এগোনো সম্ভব নয়। নিজের কাজ সম্পর্কে আরো বেশি জানার জন্য প্রচুর পড়তে হবে। সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেক শেখার আছে। শেখার আগ্রহ, দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর কর্মনিষ্ঠা থাকলে জীবনে সফল হওয়া সম্ভব।


মন্তব্য