kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বাড়ির ছাদেই চাষ

বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা ঘরের ভেতরেই শুরু করতে পারেন চাষাবাদ। শুধু শখের বসেই নয়, এটি হতে পারে বাড়তি আয়ের উৎস। বিস্তারিত জানাচ্ছেন রায়হান আহমদ আশরাফী। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাড়ির ছাদেই চাষ

চাষাবাদ করতে হলে লাগবে বড় জমি, লাঙল, আরো অনেক কিছু। কিন্তু শহরাঞ্চলে খোলা জায়গা পাওয়া বেশ ভাগ্যের ব্যাপার।

তবে আশার কথা হচ্ছে, নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা, এমনকি ঘরের মধ্যেও চাষাবাদ করা সম্ভব। অর্গানিক বা বায়োপনিক এবং হাইড্রোপনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রচলিত চাষাবাদে যে পরিমাণ জমি লাগে তার চেয়ে ১০ ভাগের এক ভাগ জায়গায় সমান কিংবা তার চেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে শিক্ষিত তরুণ ও বেকার যুবকরাও নিজেদের আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন।

 

যেভাবে শুরু করবেন

বায়োপনিক ও হাইড্রোপনিক পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এর প্রচলন ততটা নেই। বায়োপনিক ও হাইড্রোপনিক পদ্ধতি প্রায় একই রকম। তবে প্রচলিত চাষাবাদ থেকে এ পদ্ধতি অনেকটাই ভিন্ন। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এ এস এম জামাল উদ্দিন জানান, এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে হলে কিভাবে প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হয়, পানিতে অর্গানিক পদার্থ বা নিউট্রিয়েন্ট দেওয়ার পরিমাণ, পানি পরিবর্তন, ফলন সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ে অবশ্যই প্রাথমিক ধারণা নিতে হবে। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে শুরু করতে চাইলে দুই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। নিজের বাড়িতে প্রয়োজনীয় জায়গা থাকলে তাতেই শুরু করা যায়। পাশাপাশি পদ্ধতিটি শিখে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বা অন্যের বাড়ির ছাদে এ পদ্ধতির চাষাবাদ তত্ত্বাবধান করেও আয় করা সম্ভব।

 

লাগবে যা যা  

অধ্যাপক এ এস এম জামাল উদ্দিন জানান, কয়েকটি কনটেইনার, বোতল, বালতি, পানি ও বীজ নিয়েই প্রাথমিকভাবে শুরু করা যায়। সঙ্গে লাগবে পানি পরিবর্তনের জন্য মোটর বা পাম্প। এ ক্ষেত্রে অ্যাকুয়ারিয়ামে যেসব ছোট মোটর ব্যবহার করা হয় তা হলেই চলবে। সব মিলিয়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তবে প্রকল্প বড় আকারে শুরু করতে গেলে খরচের পরিমাণ বাড়বে। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে ব্যবহূত বীজের দাম বাজারের সাধারণ বীজের চেয়ে বেশি। যে ফসল উত্পাদন করতে ইচ্ছুক, তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ বীজ কিনতে হবে। অর্গানিক পদ্ধতির বদলে সরাসরি নিউট্রিয়েন্ট ব্যবহার করতে চাইলে লাগবে চাহিদা অনুযায়ী নিউট্রিয়েন্ট।

বেঙ্গল হাইড্রোপনিক্সের চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দীন জানান, ঘরের ভেতরে চাষাবাদ করতে গেলে এলইডি গ্রোয়িং লাইট ব্যবহার করতে হবে। সঙ্গে লাগবে হাইড্রোপনিক প্যানেল, বীজ ও নিউট্রিয়েন্ট। ভিন্ন মৌসুমের সবজি চাষ করতে গেলে পরিমিত তাপমাত্রা ও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন হবে। এ জন্য গ্রিন হাউস স্থাপন করতে হবে। ৫০০ বর্গফুট আকারের গ্রিন হাউসের কাঠামো, স্পেশাল নেট, স্পেশাল পলিথিন, কন্ট্রোল ডিভাইসসহ স্থাপন করতে খরচ হবে প্রায় তিন লাখ টাকা। একবার তৈরি গ্রিন হাউস ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।   

 

যেভাবে উত্পাদন করবেন

মো. গিয়াস উদ্দীন জানান, লেটুস, নেট মেলন, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম, টমেটো, তরমুজ, শসা, বেগুন, কাঁচামরিচ, লাউ, স্কোয়াশ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকোলি, মটরশুঁটি ইত্যাদি অনেক ফসল ও বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করা যায়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের সুবিধা হলো যেকোনো মৌসুমে ইচ্ছামতো ফসল উত্পাদন করা সম্ভব। সাধারণ চাষাবাদের চেয়ে সময় লাগে অনেক কম। প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনো শস্যের ফলন পেতে তিন মাস সময় লাগলেও এ পদ্ধতিতে লাগবে প্রায় দুই মাস। সময় লাগে কম, তবে ফলন হয় কয়েকগুণ বেশি। দেশীয় একটি গাছে পাঁচ থেকে ছয় কেজি টমেটো পাওয়া যায়, এ পদ্ধতিতে ফলন পাওয়া যাবে ২০ থেকে ২৫ কেজি। একই গাছে একাধিকবার ফলন পাওয়া যায়। সময়মতো পুরনো গাছটি তুলে শুধু নতুন চারা লাগালেই চলে। চারা রোপণের জন্য মাটি তৈরি বা এ ধরনের অপেক্ষার প্রয়োজন হয় না। পানি পরিবর্তন করে পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতে হবে। চাইলে ব্যবহূত পানিও প্রক্রিয়াজাত করে আবার ব্যবহার করা যাবে।

 

বিপণন

অধ্যাপক এ এস এম জামাল উদ্দিন জানান, এ পদ্ধতিতে উত্পাদিত ফসলের বাজারজাতকরণ ও বিপণনে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। বাজারে সাধারণ সবজির সঙ্গে অর্গানিক বা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উত্পাদিত ফসলের পার্থক্য আছে। হাইড্রোপনিক বা বায়োপনিক পদ্ধতিতে উত্পাদিত ফসল প্রচলিত পদ্ধতিতে উত্পাদিত ফসলের চেয়ে অনেক বেশি সময় টাটকা বা সতেজ থাকে। দেশের বিভিন্ন সুপারশপে অর্গানিক কর্নার খোলা হচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত ফসল পাওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য বিক্রি করতে হবে। সবজি বিক্রেতাদের নতুন পদ্ধতিতে উত্পাদিত ফসল বিক্রয়ে আগ্রহী করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বাইরেও উত্পাদিত ফসল রপ্তানি করা সম্ভব।

আয়রোজগার

মো. গিয়াস উদ্দীন জানান, বীজের দাম বেশি হওয়ায় বাজারের সাধারণ ফসলের তুলনায় হাইড্রোপনিক বা বায়োপনিক পদ্ধতিতে উত্পাদিত পণ্যের দাম বেশি পড়ে। সবচেয়ে কার্যকর উপায়ে ভিন্ন মৌসুমের ফসল উত্পাদন। এতে সঠিক দাম পেতে সুবিধা হবে। প্রথম দিকে প্রকল্প তৈরিতে যে পরিমাণ খরচ হবে, তা দুই বছরের মধ্যেই তুলে নেওয়া সম্ভব। পরবর্তী পর্যায়ে আয়ের পরিমাণ বাড়বে। ঠিকঠাক বিপণন করতে পারলে সহজেই লাভবান হওয়া সম্ভব।

 

নিতে হবে প্রশিক্ষণ

ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এক দিনের প্রশিক্ষণে ছাদে বাগান ও অর্গানিক পদ্ধতিতে উত্পাদন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ প্রকল্প তৈরিতে আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তাদের সপ্তাহখানেকের প্রশিক্ষণ দেয় বেঙ্গল হাইড্রোপনিক। ইন্টারনেটে অর্গানিক বা বায়োপনিক এবং হাইড্রোপনিক পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ইউটিউবে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের ভিডিও পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্লগেও পাওয়া যায় দরকারি তথ্য।


মন্তব্য