ইরানে পরিবর্তনের হাওয়া-333725 | চাকরি আছে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


ইরানে পরিবর্তনের হাওয়া

তামান্না মিনহাজ

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইরানে পরিবর্তনের হাওয়া

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে গত ৩৭ বছরে বেশ কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে সংস্কারপন্থীরা জয়ী হয়েছেন, কয়েকটিতে কট্টর রক্ষণশীলরা। ১৯৯৭ সালে মোহাম্মদ খাতামির হাত ধরে ক্ষমতায় আসেন সংস্কারপন্থীরা। আবার ২০০৫ সালে দেশকে কট্টরপন্থীদের মুঠোয় তুলে দেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।

সর্বশেষ ২৬ ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় পার্লামেন্ট এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবারের নির্বাচন ইরানের রাজনৈতিক ধারায় পরিবর্তন আনবে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সংস্কারপন্থী। এত দিন ধরে যে পার্লামেন্ট নিয়ে তিনি কাজ করেছেন তা ছিল রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ খুব মসৃণ ছিল না। পার্লামেন্টকে সঙ্গে নিয়ে চলতে তাঁকে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এই নির্বাচনে সংস্কারপন্থীদের বিজয় খুব স্বাভাবিক কারণেই তাঁকে স্বস্তি এনে দেবে। ইরানের নির্বাচন বিশ্লেষণ করে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো প্রায় সমস্বরেই জানাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক এগোনোর ক্ষেত্রে এই নির্বাচন বড় ভূমিকা রাখবে।

 

নির্বাচনের ফলাফল

এবারের নির্বাচন শিয়াপ্রধান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। এটি ইরানি পার্লামেন্ট মজলিশের দশম নির্বাচন। ২৯০টির মধ্যে ২৮৫টি (বাকি পাঁচটি সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত) এবং শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ পরিষদের ৮৮ সদস্য নির্বাচনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির সরকার জানিয়েছে, ৬০ শতাংশ ভোটার এবার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে। যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এত অধিক অংশগ্রহণের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে—প্রথমত, রুহানি সরকার যেভাবে পরমাণু চুক্তি করেছে তাতে জনগণ সন্তুষ্ট। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির কারণে অর্থনৈতিকভাবে যে স্বস্তি আসতে শুরু করেছে, সেটাও জনগণ টের পাচ্ছে। সংস্কারপন্থীরা ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে মজলিশে ৮৩টি আসন লাভ করেছে। রক্ষণশীলরা পেয়েছে ২২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট ও ৬৪টি আসন। আর উদারপন্থীরা পেয়েছে ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট ও ১০টি আসন। স্বতন্ত্র সদস্যরা ১৯ শতাংশের কাছাকাছি ভোট এবং ৫৫টি আসন লাভ করেছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে, ইরানে নির্বাচনের এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির অবস্থান শক্তিশালী করবে। এই মূল্যায়ন পূর্ববর্তী পার্লামেন্ট ও বিশেষজ্ঞ পরিষদে সংস্কারপন্থীদের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা হলে স্পষ্ট হবে। কারণ আহমাদিনেজাদের শেষ মেয়াদে মজলিশে সংস্কারপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ, আর আসন ছিল ৫২টি। বিপরীতে রক্ষণশীলরা ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট ও ১৬৫টি আসন পায়। এবার সংস্কারবাদী ও উদারপন্থীদের আসন ৩১টি বেড়েছে, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল আরো ৯৪টি আসন।

মজলিশের তুলনায় বিশেষজ্ঞ পরিষদে সংস্কারপন্থীদের ফল অনেক ভালো। এখানকার ৮৮টি আসনের মধ্যে আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানির পিপলস এক্সপার্ট তালিকা থেকে ২৯ জন জয়ী হয়েছেন। রক্ষণশীল আলী মোভাহিদি কিরমানির তালিকা থেকে জয়ী হয়েছেন ২৩ জন। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির ফ্রেন্ডস অব মডারেশন তালিকা থেকে জয়ী হয়েছেন ২২ জন। মোহাম্মদ ইয়াজদির সোসাইটি অব সেমিনারি টিচার তালিকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ১০ জন আর আলী আকবর মুহতাসিমপুরের অ্যাসোসিয়েশন অব কমব্যান্ট ক্লারিকস তালিকা থেকে জয়ী হয়েছেন মাত্র চারজন। আয়াতুল্লাহ রাফসানজানি ও রুহানির তালিকার কেউই আগে বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য ছিলেন না।

 

বিশেষজ্ঞ পরিষদের গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞ পরিষদই আগামীতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করবে—এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমান নেতা ক্যান্সারে আক্রান্ত ৭৭ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছেন। ফলে পরিষদের এই মেয়াদেই নতুন নেতা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের সংবিধান অনুসারে, প্রেসিডেন্ট বা মজলিশ নয়; বরং সব প্রতিষ্ঠানের ওপর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হলেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। এ আসনে যিনিই থাকবেন, তাঁর হাতেই রচিত হবে ইরানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তবে বিষয়টি শুধু ইরান নয়, আশপাশের আরব দেশ ও পশ্চিমা দেশগুলোর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রক্ষণশীল বা সংস্কারবাদী নয়, তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে সরকার আছে তা স্থিতিশীল কি না এবং এই সরকারের সঙ্গে কাজ করা ও যোগাযোগ সহজ কি না। রক্ষণশীলদের নিয়ে এই দুই ক্ষেত্রেই তাদের অস্বস্তি ছিল। বিদায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ ছিল একচেটিয়াভাবে রক্ষণশীলদের কুক্ষিগত। তারা এবার ৫১টি আসন হারিয়েছে।

 

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আসেন মজলিশের পাঁচটি সংরক্ষিত আসন ছাড়া বাকি ২৮৫ জন। চার বছর মেয়াদের জন্য তাঁরা নির্বাচিত হন। আর আট বছরমেয়াদি বিশেষজ্ঞ পরিষদের ৮৮ জন সদস্যও নির্বাচিত হন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে। এই বিশেষজ্ঞ পরিষদ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। এই পদ আজীবনের। তাঁকে পদচ্যুত করার মতো পরিস্থিতি দেখা দিলে সে ক্ষমতাও বিশেষজ্ঞ পরিষদের হাতে রয়েছে।

অন্যদিকে আরেক ক্ষমতাধর গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদের অর্ধেক সদস্য নির্বাচন করেন মজলিশের সদস্যরা। বাকি অর্ধেক বেছে নেন সবোচ্চ ধর্মীয় নেতা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্য; কিন্তু তাঁদের মজলিশের অনুমোদন পেতে হয়। আর মন্ত্রিসভা, সেনাবাহিনী প্রধানসহ সব শীর্ষ পদের নিয়োগে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার। তাঁদের সবাইকে দায়বদ্ধ থাকতে হয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার কাছে।

এর মধ্যে একটি তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কেউ চাইলে ইরানের মজলিশ বা অন্য কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। প্রার্থী হতে হলে তাঁকে পাঁচটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে। অন্য দেশে নির্বাচন কমিশন এই প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকে। ইরানে এ দায়িত্ব পালন করে অভিভাবক পরিষদ। এবারও সংস্কার ও উদারপন্থীদের বহু প্রার্থীকে অভিভাবক পরিষদ অযোগ্য ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইরানে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ রয়েছেন, তবে গতানুগতিক অর্থে রাজনৈতিক দল নেই। নির্বাচনের সময় কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে ইরানিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। রক্ষণশীল, সংস্কারবাদী ও উদারপন্থীরা আলাদা আলাদা তালিকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এ ছাড়া ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও দেশটির রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৮৯ সালে খামেনি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই বাহিনীর সুযোগ-সুবিধা অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দেন। কেননা তিনি জানতেন, ক্ষমতার চর্চা সহজ করতে এই বাহিনীই হবে তাঁর সহায়ক শক্তি।

 

পরিবর্তনের হাওয়া

ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে পরমাণু চুক্তি এবং অবরোধ প্রত্যাহারের পর এটিই ছিল ইরানের প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। চুক্তি ও অবরোধ মুক্তির ফসল সম্প্রতি ‘একঘরে’ দশা থেকে মুক্তি পাওয়া ইরান কতটা ঘরে তুলতে পারবে, তা সামনের দিনগুলোতেই স্পষ্ট হবে। তবে নির্বাচনে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পথ মসৃণ করবে—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর সেই পথ ধরেই আসবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। যার কিছুটা ছাপ এরই মধ্যে ফুটে উঠেছে।

সংস্কারপন্থীদের জয়ের মাধ্যমে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে সাধারণ ইরানিরা পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চায়। তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না। সংঘাতও নয়। আবার এ কথাও সত্য যে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই রুহানির সব পেরেশানির অবসান ঘটবে বা তাঁর বিরোধীদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে—এত বেশি আশা করাও ঠিক নয়।

মন্তব্য