জাপানের অর্থনীতিতে মন্দা-331000 | চাকরি আছে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


জাপানের অর্থনীতিতে মন্দা

তামান্না মিনহাজ

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জাপানের অর্থনীতিতে মন্দা

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারভিত্তিক অর্থনীতির দেশ জাপান। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী দেশগুলোর একটি ছিল জাপান। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে জাপানের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে ধীর হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি আলোর মুখ দেখতে শুরু করলেও জাপানের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারছে না দেশটি। ধীরগতিতে কমছে প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতিতে বিপুল অঙ্কের প্রণোদনা দিলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। পাশাপাশি ভোক্তা চাহিদা কমছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বে দেশটি।

 

বর্তমান অবস্থা

বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি বার্ষিক হারে দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে চারবার মন্দায় পড়ল জাপান।

কোনো দেশের জিডিপি পরপর দুটি প্রান্তিকে (তিন মাস করে) সংকুচিত হলে সেটিকে অর্থনৈতিক মন্দা বলে। এটা বিবেচনায় গত বছর টানা তৃতীয় প্রান্তিকেও জাপানের সংকোচন অব্যাহত ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০১৪ সালের পর ২০১৬ সালে এসে আবারও মন্দায় পড়ায় অর্থনীতিতে প্রণোদনা চালিয়ে যেতে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

 

মন্দার কারণ

২০১৪ সালে ভোক্তা কর বৃদ্ধি করায় অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে জাপান। ওই বছর দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি হয় রেকর্ড ১০৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন কয়েক দফায় প্রণোদনা ঘোষণা করে। বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির চাকা সচল করতে তিন বছরমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়। এরপর অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও গত বছরের শেষ ভাগে আবারও মন্দায় পড়ে দেশটি। এটিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সরকারের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে প্রণোদনা দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভার লাঘবে গত বছর এপ্রিলে জাপান সরকার সব পণ্যের বিক্রির ওপর ৫ থেকে ৮ শতাংশ কর বৃদ্ধি করে। এই কর বৃদ্ধির পর থেকেই বড় ধরনের পতন দেখা যায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সর্বশেষ মন্দার ধাক্কার জন্য এই বিক্রয় কর বৃদ্ধিই দায়ী। ফলে ভোক্তারা তাদের খরচের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন বা দিতে বাধ্য হয়েছেন; যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। এমনকি কলকারখানায় উত্পাদনও কমে গেছে। সম্প্রতি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি ও শিল্প উত্পাদন সূচকেও নেতিবাচক চিত্র দেখা যায়। মূলত সরকারি ঋণের পরিমাণ কমাতেই বিক্রয় কর বাড়ানো হয়। গত তিন বছরে জাপানে সরকারি ঋণের পরিমাণ উন্নত বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে মজুরির প্রবৃদ্ধি ঘটছে মন্থরগতিতে। স্বাভাবিক কারণেই সরকারি পরিকল্পনা উল্টো ফল বয়ে এনেছে।

জাপানের অর্থনীতি অনেকটাই রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ২০১১ সালের মার্চে ফুকুশিমার ভয়াবহ সুনামিতে বড় ধরনের ঝাঁকি খায় দেশটির অর্থনীতি। এরপর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় অর্থনৈতিক সংকটে রপ্তানি চাহিদা কমে যায়।

 

জনসংখ্যা সংকট চরমে

দুই দশক ধরে জনসংখ্যা নিয়ে বেশ সংকটে রয়েছে জাপান। নতুন আদমশুমারিতে সম্প্রতি উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে জাপানের মোট জনসংখ্যা থেকে ১০ লাখ লোক কমে গেছে। এই ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ দেয়, দেশটিতে জন্মহার আশঙ্কাজনক হারে পড়ে গেছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, জন্মহার বাড়াতে হবে।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাও দ্রুত কমছে জাপানে। পাশাপাশি বাড়ছে অবসরে যাওয়া লোকের সংখ্যা। দেশটিতে এখন প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা অপরিহার্য। দীর্ঘদিন থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল জাপান। ফলে ঋণমুক্তির বিষয়টিও অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির জনগণ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও ক্রমেই বাড়তে থাকা বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর বোঝা নিয়ে দেশটি কোন পথে এগোলে তা হবে সুবিধাজনক—এটা তাদের এখনই নির্ধারণ করতে হবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশ্ব অর্থনীতিতে জাপানের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আগামী বছরগুলোয়ও জাপানের অর্থনীতি বিশ্বে দারুণ প্রভাব ফেলবে। তাই মন্দার এই সংকট কাটিয়ে দেশটির অর্থনীতি সচল করতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের অর্থনীতিবিদ তাকাতোশি ইতো বলেন, বিক্রয় কর বাড়িয়ে ৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত না করলে ২০২৩ সালের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়বে জাপান। তিনি বলেন, জাপানে বৃদ্ধদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। উচ্চ হারে সঞ্চয়ের যে ঐতিহ্য তাদের রয়েছে, তা-ও মুখথুবড়ে পড়ছে। সরকার ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে উচ্চহারে যে ঋণ নিচ্ছে, তা জনগণের পক্ষে হজম করা সম্ভব হবে না। তবে জাপান যদি কাগুজে মুদ্রা (ইয়েন) ছেপে তার ঋণ থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে তবে তাতে মুদ্রাস্ফীতি সংকট আরো তীব্র হবে। এর গুরুতর প্রভাব পড়বে জাপানিদের জীবনযাপন মানের ওপর।

তবে অর্থনীতিবিদ জেরাল্ড কুর্তিস মনে করেন না জাপান সরকার বিক্রয় কর ১৫ শতাংশ বাড়াবে। জনগণের ওপর এ ধরনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারেরও আপত্তি রয়েছে। ২০১৭ সাল নাগাদ কর ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া থেকেই আবে সরকারের মনোভাব টের পাওয়া যায়। এর থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে যাবে।

মন্তব্য