kalerkantho

মিলেমিশে আছে ওরা

পটুয়াখালীর গলাচিপায় প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়ে তোলা এক স্কুলের খবর জানাচ্ছেন সাইমুন রহমান এলিট

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মিলেমিশে আছে ওরা

শিক্ষার্থীদের ইশারা ভাষায় শিক্ষাদান করছেন বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক

নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সোনিয়া বেগম। এই মা ডাক শুনতে বারোটি বছর ধরে অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু ছেলে স্বাধীন যে বাকপ্রতিবন্ধী! খুব আশা করে ভর্তি করিয়েছেন শরত্ বিহারী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। সে আশার ফল মিলল আজ। স্বাধীন ডেকে উঠেছে মা বলে। পরম আদরে সন্তানকে জড়িয়ে ধরেন সোনিয়া বেগম। খুশিতে কেঁদে ফেলেন। উপস্থিত শিক্ষক মো. সোহাগসহ অভিভাবকদের চোখেও জল চলে আসে। স্বাধীনের বাড়ি উপজেলা সদর ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া গ্রামে। সোনিয়া-সোহেল দম্পতির প্রথম সন্তান স্বাধীন। বলছিলেন, ‘প্রথম তো আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। আমার ছেলেকে দিয়ে কথা বলাতে খুব চেষ্টা করেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোহাগ স্যার।’

 

যেভাবে শুরু

গলাচিপা ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মো. সোহরাব আলী শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। একসময় প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়েও কিছু একটা করতে চাইলেন। 

উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে। কিন্তু তখনই শুরু করতে পারেননি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। তারপর একটি ভাড়া বাড়িতে প্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু হয়। তাঁর  আহ্বানে সাড়া দেয় স্থানীয় তরুণসমাজ। তাঁরা বিদ্যালয়ে পাঠদান ও অন্যান্য কার্যক্রমে যুক্ত হয়।

 

শেষে নিজের জায়গায়

ভাড়া বাড়িতেই কাজ চালাতে হয়েছে অনেক দিন। কখনো দুবার বাড়িও বদলাতে হয়েছে। কখনো থেমে গেছে কাজ। শেষে সমাজসেবক শরত্ বিহারী পৌর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাসপাতালের পেছনের রোডের গলাচিপা-ইটবাড়িয়া সড়কের পাশে ১০ শতাংশ জমি দান করেন। সেখানেই ২০১৬ সালে নতুন করে শুরু করে বিদ্যালয়টি। দুই ঘরের একটি টিনশেডে চলছে কার্যক্রম। প্রতিবন্ধী বান্ধব অবকাঠামো ও  ল্যাট্রিন না থাকলেও স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে খুশি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-অভিভাবকরা।

সোনিয়া বেগম ও স্বাধীন

মিলেমিশে আছি মোরা

ভাষাবিষয়ক শিক্ষক মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, অন্য শিশুদের চেয়ে বিশেষায়িত শিশুদের পড়ানো হয় একটু আলাদাভাবে। আবার ওদের ইচ্ছাগুলোর গুরুত্ব দিয়েই কাজগুলো করতে হয়। কিছুদিন আগে যেমন ব্যক্তিগত কাজে কয়েক দিনের জন্য ছুটিতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাগুলো আমাকে দেখতে পায়নি। ছুটি কাটিয়ে ফেরার পর স্কুল গেটে আমাকে দেখে প্রথম শ্রেণির মানসিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী জাফরিন ‘আদাপ’ বলে চিত্কার করে দৌড়ে আসে। এসেই জড়িয়ে ধরে। নিষ্পাপ মুখটি আমার দিকে তুলে দিয়ে বারবার বলতে থাকে আদাপ, আদাপ। ওর এই জড়িয়ে ধরা আবার বারবার আদাপ বলার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অনেক  না-বলা কথা।’

দ্বিতীয় শ্রেণির আরেক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ইমামকে নিয়ে বলেন প্রধান শিক্ষক চন্দন দাস—‘স্কুলের ব্যস্ততার কারণে দুদিন কথা হয়নি ইমামের সঙ্গে। তৃতীয় দিন থেকে ইমাম মুখ গোমরা করে বসে রয়েছে। কারো সঙ্গে কথা বলছে না। এমনকি কেউ কিছু জানতে চাইলেও  রেগে যাচ্ছে। শিক্ষকরা ইমামকে কথা বলানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। একপর্যায়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ইমামকে আদর করে যখন জানতে চাইলাম—ইমাম তোমার কী হয়েছে? ও আমার হাত ধরে কতক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাত্ করেই হেসে ওঠে। বুঝতে পারলাম আমি দুই দিন কথা না বলায় ইমাম আমার ওপর অভিমান করেছিল।’ শুধু জাফরিন আর ইমামই নয়, সব শিশুকে এমন মায়ার বন্ধনে বেঁধে রেখেছেন শিক্ষকরা। উল্লেখ্য, স্কুলটিতে এখন এক শজন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক আছেন ১১ জন।

 

ফুটবলে সেরা

শরত্ বিহারী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিশুরা খেলাধুলায়ও খুব ভালো। এরই মধ্যে রতনদী পল্লী উন্নয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং পূর্ব রতনদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ফুটবল খেলায় হারিয়েছে তারা। স্কুলের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে—দুর্জয়, স্বাধীন, রাহাত, জাহিদ, রনি, নাজমুল, জিপু, দ্বীপ, মাসুম, আরাফাত ও ইনাম। তাদের সহায়তা করে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক চন্দন ও সুজিত।

 

যদি একটু নজর দেন

বিদ্যালয়টি এখনো সরকারি অনুমোদন না পেলেও বিধি মেনে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসডিপির তদারকিতে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ালেও কিছু সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। ভাষাবিষয়ক শিক্ষক মো. মাইনুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘উপকরণ ছাড়াই ডাকাডাকি করে পড়াতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একজন শিশু দুষ্টুমি শুরু করলে অন্যরাও শুরু করে দেয়। শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সুবিধার জন্য বেশি চিত্কার করে কথা বলতে হয়। এতে একসময় নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়ি।’ আরেক শিক্ষক রাাজিয়া বেগম বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে কিন্তু বিদ্যুত্ও নেই।’

‘আমাদের সঙ্গে যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পারিনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উন্নত প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের প্রচেষ্টায় এ কাজগুলো করে যাচ্ছেন।’ বলছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা  অধ্যাপক মো. সোহরাব আলী। 

 

মন্তব্য